বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২০

সম্পর্কের অন্তরালে

"ম্যাডাম, আমরা তাহলে আজ উঠি, যদি আরও কিছু মনে পড়ে তাহলে ফোন করবেন। এত ভেঙে পড়বেন না।" রমা মাথা নাড়ে। পুলিশ অফিসার চলে গেলে দরজাটা বন্ধ করে আবার চেয়ারে বসে পড়ে। কি যে দুশ্চিন্তা, কিন্তু ভেবে কোনো কুল কিনারা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে একটা কথা জলের মতো পরিষ্কার করে জানা গেছে; তার জীবনের এই বিপর্যয়ের মূলে তার মা, হ্যাঁ, নিজের মা। গ্রেপ্তারের কথা পুলিশ বারবার বললেও সে সায় দিতে পারেনি, তার মূল্যবোধ তাকে পিছনে টেনে রেখেছে। ভাবছে আর ভাবছে, কি করবে সে এখন? এ লজ্জার কথা কাকে বলবে, কে বিশ্বাস করবে? আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সবার মধ্যেই একটা ফিসফাস, তাকানোর মধ্যেও একটা অস্বাভাবিক ভাব। অনেকক্ষণ পর চোখ মুছে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। গেটটা দেখা যাচ্ছে। রোজ সকালে বাবু স্কুলে যাওয়ার সময় ওখান থেকেই বলতো, "মা, আসি", বারান্দা থেকে সে হাত নাড়ত, বলতো, "সাবধানে যেয়ো"। নিয়মমাফিক এই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হতো রোজ। তবে, ওইদিন কি হয়েছিল? বাবু স্কুলে বেরিয়ে যাওয়ার পর রমা ছোট ছেলেকে ক্রেশে দিয়ে রোজকার মতোই অফিসে গিয়েছিল। ফেরার পথে রোজকার মতোই ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল। বাড়ি ফিরে হাত পা ধুয়ে চা বসায়। মায়ের হাতে চায়ের কাপটা দিয়ে বাবুর কথা জিজ্ঞাসা করে। মায়ের কাছে জানতে পারে যে বাড়ির পাশের মাঠের মেলায় গেছে। কথায় কথায় আরও কিছু সময় কেটে যায়। আমি আসছি, রমা বলে। মা জিজ্ঞাসা করে, কোথায় যাচ্ছ? সে বলে, দেখি বাবুকে একবার। মা বলে ওঠে, তোমায় একটা কথা বলার ছিল, বাবু বাড়ি থেকে চলে গেছে। কি, কি বললে? রমা চিৎকার করে ওঠে। তুমি তো এতক্ষন বললে না রমাকে থামিয়ে দিয়ে তিনি বলতে থাকেন, তোমাদের জন্য একটা চিঠি লিখে রেখে গেছে। ভেবেছিলাম তোমাদের খাওয়া হয়ে গেলে বলবো। কি নির্বিকার ভাবে বলে যাচ্ছেন তিনি, রমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। সে আর সহ্য করতে পারে না, চিৎকার করে বলে, “তুমি মিথ্যা কথা বলছো।" সেই চিৎকারে বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। সব শুনে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলেন, “সেই সর্বনাশটা করলে!" বলতে বলতে তিনি হু হু করে কেঁদে ফেলেন। আশি বছর বয়স তাঁর, এই বৃদ্ধ বয়সে এই শোক তিনি কি ভাবে সহ্য করবেন? কিন্তু রমার অতো কথা ভাবার সময় কোথায় এখন, সে মাকে চেপে ধরে, “সত্যি কথা বলো,বাবু কোথায়?” না, কোনো কথাই সে বলাতে পারে না। এর মধ্যে তার স্বামী ফিরে আসে। আর নিজেকে সে ধরে রাখতে পারে না, সব কথা বলতে গিয়ে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সব শুনে তিনি রমাকে সাথে নিয়ে থানায় যান। সব ঘটনা লিখিতভাবে জমা করে তারা বাড়ি ফিরে আসে। তারপর পরিচিত সব মানুষ জনের বাড়িতে ফোন করে। কোথাও থেকেই কোনো খবর তারা পায় না। একা বসে বসে ভাবতে থাকে কোথায় আছে ছেলেটা, কি খাচ্ছে, ভাবতে ভাবতেই  হু হু করে কেঁদে ওঠে সে। উফ, কি কুক্ষণে বাবার কথায় রাজি হয়েছিল। নিজের ছোটবেলাটা আবার মনের আয়নায় ফুটে উঠতে থাকে। ছোট থেকেই সে কোনোদিন মায়ের আদর পায় নি। ষাটের দশকের চাকরি করা আধুনিক মহিলা, বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী, কিন্তু প্রথম সন্তান মেয়ে? না, তিনি মন থেকে মানতে পারেন নি। বাবার দুচোখের মনি ছিল সে। দাদু ঠাকুমার আদরের দুলালী। এই আদরের বহিঃপ্রকাশ তাঁর চোখে বাড়াবাড়ি মনে হতো। তার স্বাভাবিক  জীবনের  বেড়ে ওঠার পথে পদে পদে অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন, অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এরপর তার একটি বোন জন্মায়। তারপর তার মায়ের ঔদাসীন্য আরও বেড়ে যায়। দুটি বোন একসাথে বড় হয়ে উঠছিল। তখন এইসব ঘটনা সমাজে গুরুত্বই পেতো না। মায়েরা সবসময় সন্তানের ভালো চান, তাঁরা কোনো অন্যায় করতে পারেন না, যা করেন সব সন্তানের ভালোর জন্য, এই সব চিন্তা ভাবনাই সমাজে মান্যতা পেতো। রমা পারিবারিক মূল্যবোধকে জীবনের সার মেনে মুখ বুজে সব সহ্য করে এসেছে। আর সেজন্যই বাবা যখন তাঁর অবসর জীবন বড়ো মেয়ের কাছে কাটাবেন বলে মনস্থির করেন, তখন রমা যে তার সাথে মায়ের সাথে সম্পর্কের কথা ভাবে নি তা নয়, কিন্তু স্নেহময় বাবাকে সব সময়ের জন্য কাছে পাওয়ার, সেবা করার সুযোগটুকু পেয়ে সে বাকিটা মানিয়ে নেবে বলেই মনস্থির করে।,

প্রথম কয়েক মাস আনন্দে কেটে যায়। দুই নাতিকে সঙ্গে পেয়ে বাবাও খুব আনন্দে আছেন। মা মায়ের মতো থাকেন। একদিন রাতে খেতে বসে মা সেই পুরোনো দিনের কথায় ফিরে যান। তাঁর চাকুরী জীবনের কথায়, অপূর্ণ থাকা ইচ্ছার আলোচনায়। চাকরি করার সাথে সাথে তিনি বামপন্থী সরকারি ইউনিয়নের নেত্রীও ছিলেন। দীর্ঘ দিন রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছা কাছি থাকার জন্য সাধারণ আশাগুলোতেও রাজনৈতিক ছোঁয়া লেগেছিল তাঁর। তিনি চেয়ে ছিলেন যে রমা সেই বামপন্থী দলের সর্বক্ষণের কর্মী  হিসেবে সেই দলে যোগদান করুক। কিন্তু কোন কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি । কথাচ্ছলে বল্লেও তাঁর উষ্মাটুকু তিনি পারেন না লুকোতে। সেই কবেকার একটা সাধারণ ঘটনাকে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে এত বছর ধরে চিহ্নিত করে রেখেছেন, রমা ভাবে, কিন্তু আশ্চর্য হয় না, কারণ সে তার মাকে চেনে। সেই সূত্রপাত। তারপর থেকে মাঝে মধ্যেই তিনি নিজের উষ্মা প্রকাশ করেন। বাবার সাথে ছোট খাটো ব্যাপারে অশান্তি করেন। রমা বোঝায়। এই ভাবে দিন কাটতে থাকে। একদিন অফিসে বাবুর ফোন আসে, কান্না-ভেজা গলায় সে বলতে থাকে যে দিদিমা তার সামনে ছোট ভাইকে মেরেছে।

অফিস থেকে ওরা ফিরতেই তিনি বলতে থাকেন ছোটছেলের দুস্টুমির কথা। বাবু বলে দিদিমার খারাপ ব্যবহারের কথা। রমাদের অনুপস্থিতিতে ছোট ভাইকে উত্যক্ত করার কথা। রাতে মায়ের কাছে শুয়ে বাবু জানায় সারাদিন বাড়িতে নানা অচেনা মানুষের আসার কথা। মা কে জিজ্ঞাসা করলে বলেন অফিসের  লোক, দেখা করতে এসেছিল। রমার স্বামীর বদলির চাকরি, এমতাবস্থায় তারা ঠিক করে যে দুই ছেলেকে আবাসিক স্কুলে ভর্তি করবে। এত অশান্তি, বাবা একদিন বললেন বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাবেন। রমা কেঁদেই অস্থির হলো। এই বয়সে কিভাবে পরিবার থেকে দূরে থাকবে? এর মধ্যেই দুই ছেলেকে তারা দার্জিলিংয়ের বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে। কিছুদিন বাড়িতে শ্মশানের শান্তি বিরাজ করে। কিন্তু কিছুতেই সে মায়ের লাগাতার অন্যায়ের প্রতিবাদ বাবার সামনে মুখ ফুটে করে উঠতে পারেনি। আত্মীয় স্বজনের কথা ভেবে। তিন চার মাস যে না যেতেই বড়ো ছেলে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। জন্ডিস ধরা পড়ে তার। বাধ্য হয়ে ওকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হয়। বাড়ির কাছের এক স্কুলে ওকে ভর্তি করে । মোবাইলটা বাজছে। ফোনটা ধরে সে। ওপার থেকে এক আত্মীয়ের গলা ভেসে আসে। ওরা আজ আসছে। রমা যেন মনে একটু জোর পায়। কিন্তু এ কি শুনছে সে? তারা বলতে এসেছে যে রমার মাকে যেন পুলিশ জ্বালাতন না করে; রমা প্রতিবাদ করে, এটা জ্বালাতন নয়, ওনার উপস্থিতিতে এই ঘটনা ঘটেছে। পুলিশকে সহযোগিতা করা উচিত এখন। বাবার দিকে তাকায় রমা, দুচোখ দিয়ে জল পড়ছে তার। আবার একবার বাবার ভরসার হাতটা মাথার ওপর অনুভব করে সে। চোয়াল শক্ত করে সে বলে চলে....তা নাহলে মা প্রথম দিন থেকে মিথ্যে বলছেন কেন? মাথাটা ক্রমশ পরিস্কার হয়ে আসে তার, স্পষ্ট ভাষায় সে মাকে বলে, “সত্যি কথা তোমায় বলতেই হবে, নাহলে আমি  C.I.Dর কাছে যাবো।”

“একটা কথা পরিষ্কার, আপনার মা সব জানেন", রমা চমকায় না, "শুধু বয়সের কারণে ওনাকে থানায় আনা যাচ্ছে না, থানায় আনা গেলেই উনি ব্রেক করতেন", "তাহলে তাই করুন" রমা বলে। আমরাও তারই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, কিন্তু আজ এক রাজনৈতিক নেতার থেকে ফোন এসেছে। বুঝতেই তো পারছেন, আমরা সরকারি চাকরি করি। থানায় বসে অসহায় রমা তার থেকেও বেশি অসহায় প্রশাসনিক আধিকারিকের দিকে তাকিয়ে থাকে। খানিক চুপ করে থেকে ওসি জিজ্ঞাসা করেন, “আচ্ছা, উনি কি আপনার নিজের মা, না মানে বলছিলাম যে নিজের মা হলে এই কাজটা করা ওনার পক্ষে করা সম্ভব হতো না।” কানের ভিতর দিয়ে কথাগুলো ছেঁড়া ছেঁড়া ভাবে প্রাণে গিয়ে লাগে।তার মানে স্থানীয় থানা আর কিছু করতে পারবে না। নমস্কার করে তারা থানা থেকে বেরিয়ে আসে। বাড়ি ফিরে আসার পথে সে উপলব্ধি করে যে মনের ভিতর  মায়ের সংজ্ঞাটা বদলে গেছে। আচ্ছা, কুমাতা কি সত্যিই হয়? যদিও এখন সমাজ অনেক বদলে গেছে। বর্তমান সমাজে কুমাতার উদাহরণ বিরল নয়। কুমাতাও  সমাজে এখন বিরল নয়। রাতে স্বামী স্ত্রী তে বসে ভাবে, এই ষড়যন্ত্রের হাত থেকে মুক্তির উপায় কি?

ঠিক সকাল দশ টায় C.I.D অফিসে পৌঁছায় তারা। ছেলের হারিয়ে যাওয়ার বিবরণ লিপিবদ্ধ করে। আশায় বুক বাঁধে। এবার নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা হবে। বাড়ি ফেরার পথে পিয়নের সাথে দেখা হয়। সে একটা রেজিষ্ট্রি চিঠি দিতে এসেছিল, বাড়ি বন্ধ থাকায় ফিরে যাচ্ছিল। রমার নামেই চিঠি। মনের মধ্যে তোলপাড় হয়, কিসের চিঠি? মুক্তি পন নয়তো? তাড়াতাড়ি চিঠি খুলে দেখে আদালতের সমন। এ কী নোংরা খেলায় মেতে উঠেছেন উনি? রমার বিরুদ্ধে রমার বাবাকে দিয়ে কোর্টে মামলা করিয়েছেন, মিথ্যা অত্যাচারের নালিশ তার বিষয়বস্তু। ঘেন্নায় সারা শরীর  কেঁপে ওঠে তার, এত নীচে নেমেছেন উনি যে নিজের মা হিসাবে ভাবতেও ঘৃণা বোধ হচ্ছে। কি কুক্ষণে সে ওনাদের কাছে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, বিশ্বাস করেছিল। চিঠিটা হাতে নিয়ে বাবার ঘরে যায়, তার পায়ের শব্দে বাবা ওর দিকে তাকান। রমা সেই কাগজগুলো বাবার দিকে এগিয়ে দেয়। বাবা  পড়তে থাকেন, সে খাটের উপর বসে পড়ে।

..... কিন্তু এই মামলা তো আমি করিনি, বাবা বলেন। তাহলে, তাহলে কি.......উফ, কি সাংঘাতিক ষড়যন্ত্র। বাবার বয়ানে বাবার সই জাল করে এই মামলা করা হয়েছে। এক অশীতিপর, অসহায় বাবা আর তার মেয়ে, দুজনে সেই নিস্তব্ধ ঘরে বসে আছে। বাবা ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত রাখেন, বলেন "আমায় ক্ষমা করে দিও তোমরা, আমারই ভুল হয়েছিল। আমি তো তোমার মাকে চিনতাম, পুত্র সন্তান না জন্মাবার  ক্ষোভ তার ছিল। ছেলেবেলা থেকেই তার সেই ক্ষোভের শিকার তুমি ছিলে। আমি সর্বদাই তোমার ব্যথা অনুভব করতাম। অনেক বুঝিয়েছি তাকেও। তিনি আমাকেও কোনোদিন ক্ষমা করেন নি। আমি এবং তুমি ওর কাছে সমান অপরাধী ছিলাম। সারা জীবন এই অকৃত অপরাধের ভার আমি বয়ে চলেছি। আমি ভেবেছিলাম শেষ জীবনে দুই নাতিকে নিয়ে তিনি খুশি থাকবেন। কিন্তু তার মনের বিকার যে এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে তা আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি । পর ওর এই দুটো ঘটনা আমার চোখ খুলে দিয়েছে, আজ আমার কাছে সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমার আর কিছু বলার নেই। তোমরা পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও", বলতে বলতে তিনি শিশুর মতো হাউহাউ করে কাঁদতে থাকেন। রমা চুপ করে বসে থাকে, সান্ত্বনার ভাষা হারিয়েছে সে, কি নারকীয় মানসিক অত্যাচার তিনি সহ্য করেছেন। আজ সহ্যের শেষ সীমায় এসে ভেঙে পড়েছেন একেবারে। সে ভাবতে থাকে কি কুটিলতার সাথে তার মা একটার পর একটা অপরাধ করে চলেছেন পাকা অপরাধীর মতো। একটা অপরাধকে ঢাকতে গিয়ে আরেকটা অপরাধ করছেন, কি সাঙ্ঘাতিক প্রতিশোধ স্পৃহায়। সব বোধ হারিয়েছেন তিনি। উদ্দেশ্য শুধুমাত্র রমার ক্ষতি করা। তাঁর কাছে রমা সন্তান নয়, এক না চাওয়া  সামাজিক বাধ্যতা। কি চরম মানসিক বিকৃতি। তিনি নিজে যা পান নি রমা কেও তা পেতে দেবেন না। কি ভীষণ ষড়যন্ত্র করেছেন দিনের পর দিন। কেউ অবিশ্বাস করতে পারবেনা। এখন নিজেকে বাঁচাবার জন্য মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে  দিচ্ছেন। “আমায় একটু জল দাও।" সে বাবাকে জল এনে দেয়। বাবা নিজেকে সামলে নিয়েছেন অনেকটা। কিন্তু বাবুকে তার তো খুঁজে বার করতেই হবে, তার সাথে এই মামলায় লড়তে হবে। কোথায়, কার কাছে যাবে সে, ভাবতে গিয়ে হঠাৎ তার মনে  পড়ে ব্যারিস্টার জেঠুর কথা। ছোটবেলায় বাবার সাথে যেত। হাওড়ায় বাড়ি। নামকরা মানুষ, বাড়িটা খুঁজে পেতে অসুবিধা হয় না তার। নাম পরিচয় বলতেই চিনতে পারেন তিনি। সব কথা খুলে বলে রমা। শুনতে শুনতে  তিনি স্বগতক্তির মতো বলতে থাকেন, “এত বছরেও স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হলো না, বুঝলে, কর্মক্ষেত্রেও ওনার ওই স্বভাবের জন্য  সবাই এড়িয়েই চলতো, মানুষের ক্ষতি করতে ওনার হাত কোনো দিন কাঁপে নি। সরকারি চাকরি আর রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে যা খুশি করেছেন তিনি। কেউ কোনোদিন ওনার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় নি। তুমি বোধ হয় ওনার আজীবনের শেষ শিকার। সবাই এড়িয়ে গেলেও তুমি ওনার কাছ থেকে পালাতে পারবে না, কারণ তুমি ওনার সন্তান। আত্মীয়দের চোখে তিনি তোমায় অপরাধী বানিয়েছেন, এবার আইনের চোখেও তোমায় অপরাধী বানাবেন। ওনার বয়সটাকে উনি ঢাল বানিয়েছেন। দীর্ঘদিন আমি ওনাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। মানসিক অত্যাচার করে উনি যত আনন্দ  পান, আর কিছুতে তিনি অত আনন্দ পান না।" রমা ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করে, “তাহলে কি হবে?" “আমি লড়ব এই মামলা.....রমা ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে। “চোখ মোছ, কেঁদে কোনো লাভ নেই। এ লড়াই লড়তেই হবে। তোমার জানা দরকার, তোমার বাবার ভালোমানুষির সুযোগ নিয়ে অফিসে অনেক হেনস্থা ওনাকেও করেছেন। কিন্তু কোনোদিন ভাবিনি ওনার বিরুদ্ধে মামলা লড়তে হবে। এত নীচে নামা ওনার পক্ষেই সম্ভব। আর এটাই বোধ হয় নিয়তি। সারা জীবন ধরে সবাইকে জব্দ করতে করতে আজ নিজের জালে নিজেই পড়েছেন। আদালতের ফাঁদে তোমায় ফেলতে গিয়ে নিজের কি সর্বনাশ ডেকে এনেছেন উনি জানেন না। ওনার অন্যায়ের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছে। তোমার এই কষ্ট আমি নিতে পারবো না, কিন্তু এই মামলা আমি লড়ব।" নতুন ভরসায় বুক বেঁধে রমা বাড়ি ফিরে আসে।

তার পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। আদালতে মামলা ওঠে। বাদী পক্ষ বাবা, বিবাদী পক্ষ মেয়ে, এই মামলা বাবা করেন নি, এক তৃতীয়পক্ষের জালিয়াতিতে এই বিচিত্র মামলার উৎপত্তি। এই তৃতীয় পক্ষ হলো বাবার অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করা স্ত্রী আর মেয়েটির জন্মদাত্রী মা। বাবা লজ্জায় স্ত্রীর বিরুদ্ধে কোথাও অভিযোগ জানাতে পারেন নি, স্ত্রীর কৃতকর্মের দায় নিজের মাথায় নিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। বাবাকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু এ যে কুরুক্ষেত্র, কোনো উপায় নেই। সওয়াল জবাবের শুনানিতে মাননীয় বিচারকের কিছু বুঝতে বাকি থাকে না। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই এই মামলার নিষ্পত্তি হয়। আদালত অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় বাদীপক্ষের নিন্দা করেন। মাননীয় আদালত এই মামলাকে গার্হস্থ্য হিংসার এক অন্যতম দৃষ্টান্ত হিসাবে চিহ্নিত করেন। সেই ভীষণ দিনে বাবা তাঁর বিবাহিত স্ত্রীর সকল কৃতকর্মের ফল মাথায় নিয়ে আদালত থেকে ফিরেছিলেন। তাঁর ন্যুব্জ দেহ আরও ঝুঁকে পড়েছিল। রমা পাথর হয়ে গিয়েছিল। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখেছিল সেই মহিলার আচরণ, যেন কিছুই হয় নি।

আজ বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কত কথা মনে পড়ে যায়। এক বিকৃত বুদ্ধি, অপরাধী মননের মানুষের সাথে দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন কি বিভীষিকাময় ছিল তাঁর, কি ভীষণ যন্ত্রনা তিনি পেয়েছেন সারা জীবন ধরে। কিন্তু কি অসীম ধৈর্য্যের সাথে সেই অগ্নিকে সাক্ষী রেখে করা "যদিদং হৃদয়ং তব" মন্ত্রের সন্মান আমৃত্যু রক্ষা করে গেছেন। আজ তার বাবার চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী।

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২০

এক মায়ের কথা !

 

আজ আমি জাহাজে চড়েছি। হাঁ, সত্যি। সত্যিকারের জাহাজ। ছবিতে যেমন দেখি। বিরাট বড় জাহাজ। যাব পোর্ট ব্লেয়ার থেকে ডিগলিপুর। এবার ঠিক করেছি, গাড়িতে নয়. জাহাজে, জলপথে পৌঁছব ডিগলিপুর। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উত্তরতম বিন্দু, যেখানে বসতি আছে, আছে বন্দর।

হাঁ, যে কথা বলছিলাম। জাহাজে উঠব। আটটার মধ্যে হাড্ডো জাহাজঘাটায় উপস্থিত হলাম। রাত নটায় জাহাজ ছাড়বে। একপ্রস্থ টিকিট পরীক্ষার পর জাহাজঘাটায় প্রবেশের ছাড়পত্র পাওয়া গেল। সাড়ে আটটায় জেটিতে পৌঁছে দেখি সেই বিরাট জলযান আলোয় আলোকিত হয়ে আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। দুধ সাদা শরীর তার। সেই আলো শরীর বেয়ে পিছলে যাচ্ছে। আমার জীবনে প্রথম জাহাজে চড়া। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলি। প্রবেশপথের মুখে টিকিট পরীক্ষক। ছবিতে যেমন দেখি সেই রকম সাদা জামা পরা। টিকিট পরীক্ষা করে আমায় ছাড়পত্র দিলেন। আমি প্রথম, আমার জীবনে প্রথমবার, জাহাজে পা রাখলাম। বিরাট হলঘর। সারি সারি মালপত্র রাখার খাঁচা। আমার লটবহরের লট-টাকে সেখানে রেখে বহর তিনটে হাতে নিয়ে আমি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সামনে দেখা লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলাম আমার আস্তানার কথা। টিকিট দেখে বলল, আরও উপরে উঠে যান, সামনে ডাইনিং হল, ওর ভিতর দিয়ে বাঁ দিকে যাবেন। তারপর একটা সিঁড়ি আছে। একদম উপরে উঠে যাবেন। ওরে বাবা! এত সেই সুকুমার রায়ের “ঠিকানা” কবিতা। যাই হোক, কি আর করা, আবার উঠতে লাগলাম। পৌঁছলাম অবশেষে। সুন্দর ব্যবস্থা। দুটো সাদা বিছানা। একটা কাঁচ-লাগানো জানালাও আছে। সেখান দিয়ে বন্দরের আলো দেখা যাচ্ছে। সহযাত্রী কেউ নেই। জিনিসপত্র রেখে বাইরে বেরোই। চেয়ার নিয়ে বসি।

ছোটবেলায় রূপকথায় পড়েছিলাম রাজপুত্র সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে যেত। কিন্তু তখনকার রাজাদের নাকি জাহাজ ছিল না, তাই ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীর পিঠে যেত। আমার তখন মনে হতো আমিও সমুদ্র পেরিয়ে যাব। আর ব্যাঙ্গমাকে যদি না পাই তাহলে জাহাজে চড়ে সাগর পেরোব। কারণ, ব্যাঙ্গমাকে খোঁজা সে এক হাঙ্গামার ব্যাপার। রাত্রিবেলায় অন্ধকার বনের ভিতর যেতে হয়। তারপর গাছের তলায় রাত কাটাতে হয়। তারপর দৈববশে যদি সেই গাছের ওপর ব্যাঙ্গমার বাসা থাকে তবেই তার সাথে যোগাযোগ হবে। তার থেকে আমার জাহাজই ভাল।

সেই স্বপ্ন আমার কাছে ধরা দিয়েছে আজ। আর একটু পরেই জাহাজ ছাড়বে। ঐ যে ভোঁ বাজলো। পারের দিকে তাকিয়ে আছি। জাহাজ আস্তে আস্তে এগিয়ে চলেছে। ধীরে ধীরে ঘাটের আলোগুলো বিন্দুতে রূপান্তরিত হলো। ঘড়িতে নটা বেজে আঠারো মিনিট। সমুদ্রের হাওয়ায় শীতের আমেজ। কেবিনের দিকে পা বাড়াই।

ঘরে ঢুকে দেখি কার একটা ব্যাগ রাখা রয়েছে। ভাবি বুঝি অন্য কারো ঘরে ঢুকে পড়লাম। “ম্যাডাম, আমি কি আজ রাত এই ঘরে থাকতে পারি? আপনার যদি আপত্তি না হয় তো।” তাকিয়ে দেখি এক ভদ্রলোক আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন। সঙ্গে দুজন দেহরক্ষী। তাদের মধ্যে একজন সবিনয়ে বলতে লাগলো তাদের সাহেবকে হঠাৎ যেতে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়েই তিনি ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি আর কি করি। অগত্যা ‘তাহলে থাকুন’ বলে জিনিসপত্র সরিয়ে রাখি। ভদ্রলোক অতীব ভদ্রলোক। নিজেই পরিচয় করলেন। জানা গেল তিনি ভারতীয় নৌসেনার পাইলট। বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তিনি কর্মস্থানে ফিরছেন।

ভোঁ—উঠে   পড়লাম। মায়াবন্দরের যাত্রী নামানোর সময় হয়ে গেছে। সমুদ্রের উপরে সূর্যোদয় হলো। জাহাজ আবার ঘাট ছাড়ল। আরেক ঘাটের উদ্দেশ্যে। আমি আবার ঘরে ফিরলাম। পাইলট সাহেব ততক্ষণে উঠে পড়েছেন। ‘গুড মর্নিং’ বললেন। তারপর আমাকে জাহাজ ঘুরিয়ে দেখাবেন বললেন। আমার তখন আনন্দ দেখে কে! পিছন পিছন চললাম। প্রথম নিয়ে গেলেন ডেকে। প্রতিটা যন্ত্র, মাস্তুল—তার ওপরের আলো। দড়ি, লাইফ-জ্যাকেট, লাইফ-বোট কোথায় থাকে। কিভাবে ব্যবহার করতে আপতকালীন সময়ে, সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলতে লাগলেন। তারপর নিয়ে গেলেন জাহাজের প্রাণকেন্দ্রে। যেখান থেকে জাহাজ চালনা করা হয়। কম্পাস, প্রাচীনকাল থেকে নাবিকরা নৌচালনার সময় যে পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, এখনও সেই মূল নিয়ম মেনেই জাহাজ চালনা করতে হয়। যন্ত্রপাতি অত্যাধুনিক, কম্পাস অত্যাধুনিক, কিন্তু বিদ্যুত বিভ্রাট হলে পুরোনো কম্পাসই ভরসা। কাপ্তেন সাহেব এসে আলাপ করলেন। উনি সব ঘুরিয়ে দেখানোর পর চা খাওয়ালেন। সেই সব করতেই সময় পার। দূর থেকে আমার ঘাট দেখা গেল। সবুজের, গাঢ় সবুজের আস্তরণের মাঝে একটুখানি ফাঁকা। ওই খানেই তো আমি নামব।

‘দিদি, এদিকে’—বিশুদ্ধ বাংলায় ডাক শুনে পিছন ফিরে দেখি ‘দীপঙ্কর’, আমাকে নিতে এসেছে।

পৌঁছলাম গিয়ে আমার চারদিনের আস্তানায়। এবার কেন এসেছি বলি। দূর, বহুদূর পৃথিবীর আরেক প্রান্ত থেকে কিছু অতিথি এই সময় আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কিছু নির্জন সমুদ্রতটে আসে। কেন আসে? মা হবে বলে। হাঁ, ঠিক ধরেছেন। কিছু বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রতি বছর হাজার হাজার মাইল পার হয়ে এই ভারতবর্ষের মাটিতে ডিম পাড়তে আসে। মূলত পাঁচটি প্রজাতি। গ্রিন টারটেল, হক্সবিল, লেদারব্যাক, অলিভ-রিডলে এবং লগারহেড। তারা আসে, ডিম পাড়ে এবং ফিরে যায়। তারা জানে না তাদের বাচ্ছারা সবাই ফিরতে পারবে কিনা। কিভাবে পথ চিনে তারা তাদের মা-বাবার কাছে ফিরে যাবে। অদ্ভুত এক প্রাকৃতিক নিয়মের ক্রীড়নক তারা। প্রকৃতি কার জন্য কি নির্ধারন করেছে কেউ জানে না। আমি এসেছি সেই কচ্ছপ-মায়েদের সাথে দেখা করতে।

সমস্ত সমুদ্রতটে এখন জরুরী অবস্থা চলছে। পর্যটকরা রাত্রে বিশেষ কিছু সমুদ্রতটে  যেতে পারবেন না। কারণ, ভয় পেলে সেই বিশেষ সময়টুকুর ব্যবহার না করতে পারলে সেই আসন্ন প্রসবা কচ্ছপ-মা অসহায় হয়ে পড়বে। বিশেষ সময় বলছি তার কারণ আছে। অনেকগুলো শর্তের ওপর এই প্রসব করা নির্ভর করছে। দিনের বেলায় এই ঘটনা ঘটেই না। ঘটলেও তা প্রায় বিরল ঘটনা বলে গণ্য হয়। রাত্রিবেলা সমুদ্রে ভরা জোয়ারের সময় এই মা কচ্ছপরা জল ছেড়ে বলিয়াড়িতে উঠে আসে। তারপর নিজে পছন্দ মত জায়গায় বালি খুঁড়ে তার ভিতরে ডিম পাড়ে। এক সাথে প্রায় একশো দেড়শো ডিম পাড়ে।তারপর আবার বালি চাপা দিয়ে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে আবার সমুদ্রে ফিরে যায়। যাবার সময় আর পিছন ফিরেও দেখে না। প্রকৃতির কি অদ্ভুত নিয়ম। অনাগত সন্তান তার, অজানা পরিস্থিতিতে, নিষ্ঠুর সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তার মায়ের সাথে দেখা করবে বলে আবার সমুদ্রগামী হবে। এই সমস্ত ঘটনা ঘটতে মাত্র একঘন্টা থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। ভরা জোয়ারেই মাকে আবার সমুদ্র ফিরে যেতে হবে।

এর পরের ঘটনার সাক্ষী হতে আমার এইবারের আন্দামান যাত্রা। সময় আর কাটে না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। বিকেলে একবার ঘুরে এসেছি সমুদ্রের ধার থেকে। সমুদ্রও শান্ত। শুধু হাওয়ায় হাওয়ায় ফিসফাস। তারা আসছে, তারা আসছে। শুনে ছিলাম এই প্রজাতির কচ্ছপরা যেখানে জন্মগ্রহণ করে তার নিজেদের প্রসবের সময় সেখানেই ফিরে আসে। এটাই পরম্পরা। আবহমানকাল এই নিয়মের অনুসারী তারা। প্রসবের পর কাঁদতে কাঁদতে মায়েরা ফিরে যায়। ভাবতে ভাবতেই মন ভারী হয়ে ওঠে। গলার কাছে কি একটা দলা যেন আটকে যায়। আপনিই চোখ আমার জলে ভরে ওঠে।

মূলত, অস্ট্রেলিয়া থেকে এই কচ্ছপরা আসে। শিশু জন্মানোর পর বাচ্ছাদের খোলের উপর বনদপ্তরের কর্মীরা অস্ট্রেলিয়ার ছাপ লাগিয়ে দেয়। যে কচ্ছপরা আসে তাদের পিঠের খোলের উপর অস্ট্রেলিয়ার ছাপই এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

রাত সাড়ে নটা নাগাদ আমি তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঈশ্বরকে স্মরণ করলাম। এমন এক মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি যে মা নিশ্চিন্তে তার সন্তানের দায়িত্ব প্রকৃতি মায়ের হাতে ছেড়ে দিতে পারে।

সমুদ্রের ধারে হাওয়া বইছে। আকাশ তারায় ভরা। জোয়ার এসে গেছে। জলের কুলু কুলু ঢেউ এখন ছলাৎছল বলছে। বনকর্মীরা সবাই সমুদ্রতটে ছড়িয়ে পড়েছে। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। সময় আর কাটে না। আসবে তো? তার সাথে দেখা হবে তো আমার? পৌনে এগারটার সময় সবাইকে পিছনে সরে যেতে বলা হলো। এসেছে, সে এসেছে। দুটো মোবাইলের টর্চের আলোর বিন্দু তার পাশ দিয়ে চলেছে। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে আসছে। অত পথ পাড়ি দিয়ে সে এসেছে শুধু তার সন্তানের জন্ম দিতে। আসন্ন প্রসবার প্রসব যন্ত্রনাও শুরু হয়েছে হয়তো। এক সময় সে থামে। আমি দম বন্ধ করে বসে আছি। এক জাগতিক সত্যের অপেক্ষায়। অবশেষে এল সেই মুহূর্ত। সে প্রথম ডিম দুটো প্রসব করল। হাঁ, এক সাথে দুটো করে ডিম। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আমার। আমি প্রকৃতির এই চরম রহস্যের সাক্ষী হয়ে থাকলাম। বন দপ্তরের কর্মীরা পিছন দিক থেকে বালি সরিয়ে দিচ্ছেন। আমি ধীরে ধীরে মায়ের মুখের ঊপর হালকা আলো ফেললাম। মায়ের মুখ গর্বে ভরে উঠেছে। প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ আস্বাদনের আনন্দে সে মুখ আলোকিত। তার দু-চোখের কোণে ঐ কি চকচক করছে? ধীরে তার পিঠের ওপর হাতটা রাখলাম। মাথাটা উপর দিকে তুলে দুবার সে ঢোঁক গিলল। গলা থেকে তার কি এক শব্দ হলো। হয়তো ঈশ্বরের কাছে সন্তানসকলের মঙ্গল কামনা করলো। হয়তো সদ্যজাতককে ছেড়ে যাওয়ার অসহ্য ব্যথা জানালো অথবা ঈশ্বরীয় নিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করল। জানিনা, তার চোখের জল আমার মাতৃসত্বাকেও ছুঁয়ে গেল। খোলা আকাশের নীচে সেই মায়ের সাথে আমিও কাঁদতে লাগলাম। তারপর আমার অবচেতনায় যেন শুনতে পেলাম, ‘আমি মা হয়েছি’।

তার ডিম পাড়া শেষ হয়ে গেছে। সে ফিরে যাচ্ছে। না, একবারও পিছন ফিরল না সে। ধীরে ধীরে প্রসবের ক্লান্তিকে সাথী করে, মা হবার গর্বে, আনন্দে তার ভাবীকালের সন্তানকে প্রকৃতি মায়ের হাতে সঁপে দিয়ে সে এগিয়ে চলেছে সাগরের দিকে। যে পথ দিয়ে তার সন্তানেরা তার যাত্রা সম্পূর্ণ করবে।

শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২০

ব্রতকথা !

 

আজ দিনটা খুব গরম ছিল। বিকেল বেলায়  ছাদে ওঠা এখন  প্রায় অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। গরমের জন্য আজ একটু দেরীতেই ছাদে উঠলাম । গিয়ে দেখি দিনমনি আজকের যবনিকাপাতের সব অনুষ্ঠানই সম্পূর্ণ করে ফেলেছেন প্রায়। পাখিও আর ডাকছে না। সূর্যাস্তের আর বিশেষ বাকি নেই। পৃথিবী শান্ত হয়ে এসেছে। সাত অশ্বের রথ মর্ত্যলোকের সীমা পার করে মেঘ রাজ্যে ঢুকে পড়েছে । ঘোড়ার ক্ষুরের আঘাতে মেঘগুলো ছোট ছোট টুকরো হয়ে যাচ্ছে । সেই রথের পাশ কাটিয়ে সন্ধ্যা নামছে ধীরে। আমি সেই দিকেই তাকিয়ে আছি। সামনে দিয়ে একা এক পাখি উড়ে গেল। সেই রথের উপর থেকে তিনি হাত নাড়ছেন। আমিও হাত জোড় করে তাঁকে প্রনাম জানাই। আজকের মত বিদায়। সেই টুকরো হয়ে যাওয়া মেঘগুলো আবারও হাত ধরাধরি করে এক হয়ে গেছে। এই দৃশ্যপটের ওপর তারা যবনিকা টেনে দিলো। এক মহাজাগতিক দিনের অবসান ঘটলো। 

এই রেশ টুকু যেন আর কাটতে চাইছে না। মন বলছে যেন এখানেই শেষ নয়, আরো কিছু আছে, আরো কিছু.........। এক ব্যথা বহুকাল, সে যে কতকাল, সে আর এখন মেপে বলতে পারি না, বয়ে নিয়ে চলেছি। সে ব্যথা একান্ত আমার। তাকে রাখি এমন আধার এই পৃথিবীতে নেই। অত্যন্ত মূল্যবান সে ব্যথাটুকু বর্তমানে আমার সম্পদে পরিণত হয়েছে। তাকে অতি যত্নে অন্তরের গভীরে, সেই যেখানে একটি দীপ অনির্বান শিখায় জ্বলছে, সেই আলোটির পাশেই রেখেছি। সেই শিখাটির আলো ছাড়া যে এই ব্যথার অস্তিত্ব অনুভবেই আসবে না।

তারপর সেই কত রাতের বেলায় চারপাশের আঁধার চিরে বিদ্যুৎ চমকায়। গুরু গুরু সারা আকাশ জুড়ে বাজতে থাকে। সেই বিপুল উৎসবের সাক্ষী হয়ে প্রকৃতি আনন্দে আত্মহারা। গাছেরা আনন্দে লুটোপুটি খাচ্ছে। গাছে গাছে পাখির ডাক, সময়কে অকালে জাগিয়ে, প্রকৃতিকে আনন্দে মাতিয়ে অশুভকে সন্ত্রস্ত করে তার এই উপস্থিতি আমার সত্তাকে প্রান প্রাচুর্যের ধারায় ভরিয়ে তোলে। আমার সত্তা জেগে ওঠে। চারপাশের সকল ভাঙ্গনের শব্দে, অনুভবে যে বিশ্বাসের জোর অবিশ্বাসের পাঁকে চাপা পড়ে গিয়েছিল, সেই পাঁক সরে গিয়ে আবার, আবারও একবার সকল শুভ ইঙ্গিত ঝলমলিয়ে উঠলো। সেই প্রলয় ছন্দে অন্তরের দীপশিখাটিও কেঁপে উঠলো। আজ এই মধ্যরাত্রের প্রলয় যাপনে রবি ঠাকুরের সেই কথাটি মনের ওপর দিয়ে বয়ে গেল, আর সকলেরে তুমি দাও, শুধু মোর কাছে তুমি চাও। এই মরুজীবনের পথে কত বার কত রূপে এসেছ এই ব্যথাটুকু হরণ করতে। তোমার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছো, বিনিময়ে চেয়েছো এই ব্যথাটুকু। না, কোনো প্রলোভনেই এই বিনিময় পূর্ণতা পায় নি। আজ তুমি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছো যে এ ব্যথা নিতান্তই আমার। তুমি ব্যর্থ হয়েছো। এই ব্যথাব্রত সাধনার আমিই সাধক। আর তাই, বারবার ফিরে ফিরে আসো আমার সাধনার তপোমন্দিরে। অতি যত্নে সুকোমল হাতে সব দুঃখ মুছিয়ে দাও। কিন্তু দুঃখের চিহ্ন মুছে দেওয়া, সে বোধহয় তোমারও সাধ্যের বাইরে। এক্ষেত্রে তোমারও সীমা নির্ধারিত করা আছে। জীবনের দুঃখকাল সময়ের সাথে অতীত হয়, কিন্তু দুঃখকালের স্মৃতি? সে শুধু ব্যথাই বয়ে আনে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তোমার নিজের হাতে যে দুঃখ দান করেছিলে আমায়, এতদিন পরেও কি সেকথা ভুলতে পেরেছো? আজ তোমার ব্যথাও সীমাহীন। এ ব্যথা তোমারও যাবার নয়। তাই তো আজ মন্দিরে আমার সাথে তোমারও আসন পেতেছি। একসাথে আজ দুজনেই এই ব্যথাব্রত উদযাপন করবো।

এসো..................

বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২০

নদীর উজানপথে !

বিজ্ঞান বলে, এই পৃথিবীতে সবই নাকি আছে, শুধু খুঁজে নিতে হবে। বেশ কথা। কিন্তু কি খুঁজবো? কবি বলেছেন, খ্যাপা পরশ পাথর খোঁজে, অর্ধেক জীবন ব্যয় হয়ে যায় তার, কোনো এক সময় পেয়েও শুধুমাত্র না চিনতে পারার জন্য আবার হারিয়ে যায়। জীবন সায়াহ্নে এসে সে উপলব্ধি করে যে আবার তাকে পুরোনো পথেই ফিরে যেতে হবে, কারণ ওই পথেই সে অসাবধানে সেই অমূল্য রতনটি ফেলে এসেছে। ঠিক এই খানেই সেই অমোঘ প্রশ্নটি মনে জাগে, সময় পাওয়া যাবে কি? কে জানে.......

আসলে আমরা সবাই সর্বক্ষণই কিছু না কিছু খুঁজে চলেছি। তাই না? আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আমিও খুঁজে চলেছি। শহুরে জীবনের বিস্তর খোঁজাখুঁজির মাঝে জীবনটাই হারিয়ে গেছে। এখন বেঁচে আছির বদলে টিকে আছি বললেই বোধহয় সত্যটুকু সুবিচার পায়।

বেশিদিন বাড়িতে থাকতে পারি না। দমবন্ধ লাগে। সময় সুযোগ বুঝে হরিদ্বার যাওয়ার টিকিট কাটি।.....ভোরেরবেলায় ট্রেন থেকে নেমে হোটেলে যাই। তারপর স্নান সেরে সোজা হর কি পৌড়ি ঘাটে।...দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি কত মানুষ, ভোর থেকেই পুণ্যার্থী, সাধু, ভবঘুরে সবাই একঠাই। কেউ শীতল হয়, কেউ পুন্য মাপে। আর কত যে ভিখিরি, কেউ গেরুয়া বসনে, কেউ ছিন্নবস্ত্রে। এই ভারতবর্ষে যুগে যুগে গঙ্গার ধার বরাবর এই ভিক্ষাকর্মীদের এক চলমান জীবনযাত্রা। সে বিশ্বনাথের কাশীই হোক অথবা এই হরিহরের দুয়ার, এর কোনো পরিবর্তন নেই। রোদ বাড়ে, আমি ফেরার পথে ধরি। সন্ধ্যার আগে আবার আসি। একটু পরেই আরতি শুরু হবে। ধীরে ধীরে আরতি দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে। আরতি শেষে যে যার ঘরে ফিরে যায়। শেষ সন্ধ্যায় ঘাটেরও ক্লান্তি আসে। পাহাড়ের হাওয়ায়, গঙ্গার কুলু কুলু ঘুমপাড়ানি গানে ঘাটও একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। বসে আছি ঘাটের কিনারায়, নদীর জল ছুঁয়ে, এই সময় অনেক পুরোনো কথা মনে আসে। জলে ফাঁড়া ছিল বলে ছোট বেলায় জলের কাছে যাওয়া বারণ ছিল। আজ নদীর জল ছুঁয়ে বসে আছি। কেউ আর নিষেধ করার নেই, সবাই আজ আকাশের তারা হয়ে গেছে। হয়তো সেখান থেকেও বারণ করছে, কে জানে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। চাঁদের হালকা আলো নদীর শরীরে ছায়া জড়ায়, সেই অন্ধকারে, নদী পাশ ফিরে শোয়। ওপারের দোকানগুলোর আলো সব নিভতে শুরু করেছে, এবার ফিরতে হবে। নদীকে বলি, কাল আবার আসবো, কেমন? এই আমার এক রোগ, সবার সাথেই কথা বলি। পিছন থেকে কে যেন টেনে ধরে, একবার আমার উজানে যাবে? আমার ছোট বেলার খেলাঘর। পিছন ফিরি, কই কেউ না তো, শুধুই কুলু কুলু কুলু কুলু.........। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়, উঠে পড়ি। প্রথম বাসটাই ধরবো ।.....

বাসে উঠে একটা জানলার ধারে জায়গা পেলাম। বাস চলতে শুরু করতেই না ডাকতেই ঢুলুনি এলো, জলদি উতরো, ঘুম ভেঙে যায়, ব্যাসী পৌঁছেছি। আলুর পরোটা আচার দিয়ে খেয়ে আবার নিজের জানলার ধারে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। স্কুলের পোশাক পরা ছোট ছেলেরা স্কুলে যাচ্ছে, কোথাও বা রাস্তা তৈরি হচ্ছে। কোথাও  পাহাড় থেকে নেমে আসা ধারায় দৈনন্দিন কাজ সারছে গ্রাম র মানুষ। হিমালয়ে সাধুবাবারা হেঁটেই চার ধাম দর্শন করেন, তাঁরাও হেঁটে চলেছেন, হাতে কমন্ডলু, পিঠে এক ঝোলা। মাঝে মাঝে বাস দাঁড়াচ্ছে, দুচার জন নামছে, কেউ বা উঠছে। এই হলো হিমালয়ের পথে যাত্রার চলমান ছবি।

এসে গেলাম দেবপ্রয়াগ। ভাগীরথী আর অলকানন্দার বিবাহ স্থল। ওপর থেকেই দুজনার হাতে হাত রেখে চিরজীবন সাথে চলার অঙ্গীকারের চিরপরিচিত ছবিটি বেশ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়ে হরিদ্বারের ঘাটে র কথা। গঙ্গা তো এক ধারা নয়, তিন ধারা মিলিত হয়েছে। এখন কি করি, অবশেষে ঠিক করলাম অলকানন্দার উজানেই যাবো। রুদ্রপ্রয়াগে আজকের যাত্রাপথের বিরতি।

আজ জসীমঠ যাবো। গাড়োয়ালের সব শহর গুলোতেই অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কুফল ফলতে শুরু করেছে। এ পথের দূরত্বও অনেক। সারাদিন ধরে চলে নন্দপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ সব পার করে  চলেছি। চায়ের বিরতি। গাড়ি থেকে নাম হলো।  উল্টো দিকে তাকিয়ে দেখি এক বড় পাহাড়ি নালা, তাকে নালা না বলে নদী বলাই ভালো, ডানদিকের এক উপত্যকা থেকে নেমে এসেছে। কি নাম ভাই, তোমার? তার উচ্ছলতা অবাক করে আমায়। আমার নাম বিরহী গো, বিরহী। আমি একটু ঠাট্টা করে বলি, কিসের বিরহ তোমার, আর বিরহে বুঝি কেউ নাচে? সে নুড়ির নুপুর বাজিয়ে এক  পাক নেচে নিলো। এক দমকা হাওয়ায় গাছ থেকে কত পাতা যেন ঝরে পড়লো। আমার  দিকে তাকিয়ে বলল, কোন দেশ থেকে এসেছ তুমি? বিরহই তো নাচের উৎস। না হলে শুধু শুধু কেউ নাচে? আমাদের দেবাদিদেব মহাদেব, তাঁর স্ত্রী সতীর বিরহে কত কেঁদেছেন, তারপর সেই প্রিয়দেহ বুকে নিয়ে যে ছন্দে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছিলেন, সেটাই তো নাচ। সেই নাচের তালে পৃথিবী কেঁপে উঠেছিল, দেবতারাও জেগে উঠেছিলেন। আহা, কতদিন আর অমন নাচ দেখিনা, বলতে বলতে সে উদাস হয়ে গেল। কতক্ষন সে চুপ করে রইলো, তারপর যেন আপনমনে বলতে লাগলো, তাঁর তো সেই শোকের আর বিরাম হলো না। তিনি তো এখনো কেঁদেই চলেছেন। সে অশ্রু ধারাই তো আমার উৎস। তাই তো আমার নাম বিরহী। সেই দুঃখ ধারা আমি যুগে যুগে বয়ে নিয়ে যায় সাগরে, তা নাহলে এই হিমালয় পর্বত কবেই তলিয়ে যেত। আমি হাঁ করে শুনছি, হঠাৎ সম্বিৎ ফেরে তার, বলে, দেখলে তো কত দেরি করিয়ে দিলে আমায়। সরো দেখি, পথ ছাড়ো, বলতে বলতেই ছুট দিলো। সেই বিরহের ছন্দ আমার প্রাণের গভীরেও কি এক ব্যথার মূর্ছনা জাগায়। আবার গাড়ি চলে। অবশেষে জসীমঠ পৌঁছলাম। প্রায় চারটে বাজে। আজ এখানেই থাকবো। কাল প্রথম গেট ধরে বদ্রিনাথ যাবো। রাতের আলো ঝলমলে জসীমঠ ভারী সুন্দর। অনেক নীচে অলকানন্দার স্রোতকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে। সেই কর্মকান্ডের আলোয় সারা পাহাড় আলোকিত। চাপা এক কান্নার আওয়াজ, কে যেন গুমরে গুমরে কাঁদছে?

ভোরে উঠে মন্দিরে প্রনাম করে বদ্রীনাথ মার্গে দাঁড়িয়ে আছি। আজকের গন্তব্য বদ্রীনাথ হয়ে মানাগ্রাম । এই গ্রামটি এই পথের শেষ জনপদ। এর পর আর কোনো জনবসতি নেই। এই জসীমঠ থেকে বদ্রীনাথ পঞ্চাশ কিলোমিটার রাস্তা। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম। কি ভিড়, ভক্তদের। ভক্তছাড়া ভগবান অচল। একটু এগিয়ে ঝোলাপুল পার করলেই স্বয়ং বদ্রীবিশালের দরবার। নীচ দিয়ে বয়ে যায় অলকানন্দার ধারা। এককাপ চা খেয়ে মানাগ্রামের গাড়ি ধরি। গ্রামে পৌঁছে স্থানীয় পঞ্চায়েতের সাথে কথা বলে তাঁবু লাগাই। সব ব্যবস্থা করে পায়ে পায়ে ভীম পুল পার করে  এগোই। এই পথ সোজা চলে গেছে বসুধারা প্রপাতের পায়ের কাছে। সরস্বতী মন্দিরের পাশ থেকে সগর্জনে বেরিয়ে আসছেন মা সরস্বতী। প্রবল শব্দে কান পাতা দায়।  কোথায় সেই শ্রীপঞ্চমীর শান্তশিষ্ট  রূপের  ঠাকরুনটি, একী ভয়ঙ্কর রূপ তার, বুকের ভিতর কেঁপে ওঠে। এত শব্দে পাশের লোকের কথাই শোনা যায় না, তো আমার বিড়বিড় করে চাওয়া তিনি শুনবেন কি করে? মরিয়া হয়ে প্রানপনে চিৎকার করে বলি, বিদ্যা দাও। কি যে আশীর্বাদবানী উচ্চারিত হলো বলতে পারি না। বাঁদিকে অনেক নীচে গিয়ে সেই ধারা অলকানন্দায় মিশে যাচ্ছে। সেই মিলনস্থল কেশবপ্রয়াগ নামে পরিচিত। দেখতে দেখতে উপত্যকায় সন্ধ্যা নামে।  আর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রকৃতির আঙিনা তারার আলোয়  আলোকিত হয়ে উঠবে। বদ্রীনাথের শয়ন আরতিও হয়তো শুরু হয়েছে। কেশবপ্রয়াগের পুলের অপর পারে হালকা এক পথের নিশানা, আগামীকাল ওই পথ ধরেই আমি যাব। ওই অস্থায়ী কাঠের পুলটিই এপারের সাথে ওপারের একমাত্র যোগাযোগকারী সূত্র। ফী বর্ষায় অলকানন্দা ওকে ভাসিয়ে নেয়, ওর চোখেও তখন অলকানন্দার মতই সাগর মিলনের স্বপ্ন, কিন্তু কোনোদিনই সে সাগরে পৌঁছয় না। নদীর কোন বাঁকে যেন আটকে পড়ে। পাহাড় বড়ো মায়ায় তাকে পিছনে টেনে রাখে। নিকষ অন্ধকার নেমে আসছে, পাহাড়ের উপত্যকায়। সেই অন্ধকারে কে কাঁদে, খুব চাপা অথচ খুব স্পষ্ট, সে গুমরানো কান্না। সেই কান্না যেন পাহাড়ের অন্দরে ঘুরে ঘুরে মুক্তির পথ খুঁজে বেড়ায়। সরস্বতীর উদ্দাম গর্জনের সাথে মিশে সে গুমরানো কান্নার আওয়াজ সেই অন্ধকার রাতে কি এক আসন্ন মহাবিপদের সূচনা চিহ্নিত করে চলেছে।

সকাল হয়। চারপাশে ছোট পাখির কলতান। উঁচু উঁচু সাদা মাথার বৃদ্ধ পাহাড়ের সারি, হাসিমুখে স্বাগত জানায়, কুশল জিজ্ঞাসা করে। তাঁদের প্রনাম জানাই। সূর্যের আলো তাঁদের আশীর্বাদ বয়ে আনে, সেই  স্পর্শ আমায় পুন্যাঙ্গ করে, শিহরণ জাগায়। আসলে হিমালয় দেবভূমি। সমগ্র হিমালয় অঞ্চলই সেই প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত পুণ্যব্রত  মহান ঋষিদের তপস্যা ভূমি। সেই তপস্যার পূতফল সেখানকার আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে আছে। আমায় যেতে হবে সত্যের পথ ধরে সেই পুন্য সলিলার আঁতুড় ঘরে, যেখানে যেতে গেলে শরীরের সাথে সাথে মনের  শুদ্ধতার আবশ্যিকতাও বাধ্যতামূলক। সব গোছগাছ করে বেরিয়ে পড়লাম। অনেকটা পথ আজ হাঁটতে হবে তাই আমার পথ প্রদর্শক সংগ্রাম সিংকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। সোজা উৎরাই পথে কালকের দেখা কাঠের পুলটার কাছে নেমে আসি। তারপর সেই পুলটা পার করে ডানদিকের চড়াই পথ ধরে এগোতে থাকি। খানিক এগিয়ে পশ্চিমমুখী পথের বাঁপাশে এক ছোট্ট মন্দির। মূল পথ ছেড়ে পায়ে পায়ে উঠে আসি মন্দিরের চাতালে। চারপাশ তাকিয়ে দেখি, জনবসতির কোনো চিহ্নই চোখে পড়ে না। মন্দিরটিও তালা বন্ধ। একটু হতাশ হই। পাহাড়ে সূর্যের তেজ খুব চড়া । জল খেয়ে সংগ্রাম কে জিজ্ঞাসা করি। সংগ্রাম বলতে থাকে। সেই কবেকার কথা। নর ও নারায়ণ নামের  দুই ঋষি এই বদরিকা আশ্রমে এসে নারায়ণের তপস্যা শুরু করেন। সেই দুই ঋষির অভাগিনী মা শুধু সন্তানদের চোখে দেখতে পাওয়ার আশায় সেই স্থানে এসে ঘর বাঁধেন। আমি যেন সেই যুগে পৌঁছে গেছি। সেই পাণ্ডববর্জিত পাথরের সমুদ্রে এক মা শুধুমাত্র পুত্রমুখ দর্শনের ইচ্ছায় সেই ভীষণ স্থানে যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করছেন। কথিত আছে, বছরে এক বিশেষ দিনে তিনি দুই পুত্রের দর্শন পান। প্রত্যেক বছর শ্রাবনমাসের দ্বাদশী তিথিতে (যা বামন দ্বাদশী নামে পরিচিত) বদ্রীনাথ থেকে তাঁর দুই পুত্র ডোলিতে চেপে মাতৃদর্শনে আসেন। সেই দিনটি সেই মায়ের জন্য সবচেয়ে আনন্দের দিন।সেই উপলক্ষ্যে ঐ দিন মন্দির চত্ত্বরে বিরাট মেলা বসে। তারপর ঋষিদ্বয় আবার বদ্রীনাথে ফিরে যান। আর সেই স্নেহপরায়না মাতৃহৃদয় একাকী সেই ভীষণ বিপদসংকুল প্রদেশে আবার এক বছরের জন্যে সন্তানদের প্রিয়মুখ দর্শনের আশায় অপেক্ষায় বসে থাকেন। সেই জন্য মন্দিরটি মাতৃ মূর্তি মন্দির নামে পরিচিত। শুনতে শুনতে আমার চোখের জল আর বাধা মানলো না । এক আশ্চর্য উপলব্ধি হলো। ঈশ্বর কি এমন বস্তু যার জন্য মাকে এত কষ্ট দেওয়া যায় আর সন্তান কি এমন বস্তু যে যার জন্য পৃথিবীর সব কিছু ত্যাগ করা যায়? এই নিষ্ঠুরতার অনুষ্ঠানের একমাত্র সাক্ষী সেই ঈশ্বর, যার উপাসনায় পুত্রেরা মাকে এত যন্ত্রনা দিচ্ছে। এই কথাগুলো যত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়া যায়, ততই ভালো। নিদারুন  মানসিক যন্ত্রনায় এই ব্যথাতুর মানব হৃদয়, সেই ঈশ্বর আর তাঁর উপাসকদের প্রানভরে অভিশাপ দিলো। তারপর নিজের চোখের জলে মায়ের মনের ব্যথার উপশমের চেষ্টায় মন দিলো। সন্তানের নির্মমতায় মা যে পাথর হয়ে গেছেন। সন্তান আর সন্তাপের মানে কি এক? দিদি, দিদি উঠো, মত রোও ইতনা, চলো, বহত দূর যানা হ্যায়। সংগ্রামের ডাকে যেন স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। কী এক অসহ্য যন্ত্রনা থেকে পলকে মুক্তি পেয়ে বাস্তবে ফিরি। মাতৃমন্দিরে সাষ্টাঙ্গে প্রনাম করে পথে নামি। দূর থেকে ডানদিকে বসুধারার স্বর্গীয় ধারা দেখা যাচ্ছে। ঐ ধারাজল সারা ভারতের তপস্যাব্রতীদের বড় সাধনার ধন। কথিত আছে যে, পাপী শরীরে ওই জল স্পর্শও করে না। সামনে এক ভাঙাচোরা হিমবাহের ফুটিফাটা পাথুরে অঞ্চল। ঝুরঝুরে পাথর আর বালি মাটির এক বিপদজনক সংমিশ্রণ। ওর ওপর দিয়েই আমাদের রাস্তা। সাবধানে, ধীরে ওই চড়াইটা পার করে ওপরে উঠে আসি। ডানদিকের খাতে হিমবাহের হাঁ মুখ দিয়ে অলকানন্দা বেগে বেরিয়ে আসছে। এরপর খালি চড়াই আর চড়াই। সাবধানে বোল্ডারের ওপর দিয়ে দিয়ে এগিয়ে চলেছি। পথের অপরূপ সৌন্দর্য, বর্ণনার অতীত। ফুলে ফুলে উপত্যকা ভরে আছে। আর হবে নাই বা কেন, এ পথ যে স্বর্গের পথ, সত্যের পথ। এই পথ দিয়েই তো যুধিষ্ঠির সপরিবারে মহাপ্রস্থান করেছিলেন। সমগ্র মহাভারতের মধ্যে এ এক অপূর্ব অধ্যায়। কী উন্নত দার্শনিক চিন্তার সমন্বয়, তুমি যেই হও, সময় ফুরোলে নিঃস্ব  হয়ে একাকী এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। পিছন ফিরে দেখা চলবে না। এই দার্শনিক চিন্তার এই রকম অপূর্ব, তুলনাহীন প্রয়োগ আর সারা পৃথিবীতে কোথাও নেই। এই একটি মাত্র পথ, যা স্বর্গারোহনের পথ হিসাবে চিহ্নিত। এই পথ ঈশ্বর উৎসর্গ করেছেন মানব জাতির উদ্দেশ্যে, যে মানুষ নিজেকে ওই স্তরে উন্নীত করতে পারবে, ওই পথে তাঁরই অধিকার। ভাবতে গিয়ে সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আবারও এগিয়ে যাই। খানিক এগিয়ে একটা সমতল মতো জায়গা। আজ এখানেই রাত্রিবাস। এই জায়গাটির নাম লক্ষ্মীবন। সবাই মিলে হাতে হাতে তাঁবুগুলো লাগিয়ে ফেলি। তারপর গিয়ে কাছের এক উঁচু পাথরের ওপর বসে পড়ি। আঃ ! আজকের মত পা-দুটোর বিশ্ৰাম। চারপাশে তাকিয়ে দেখি, এযে একেবারে স্বর্গের চার রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি। ডানদিক থেকে সামনে বসুধারা জলপ্রপাতের ধারা অবিশ্রাম ঝরে পড়ছে। না, পড়ছে না, এলোমেলো হাওয়ায় আঁচলের মতো উড়ছে। সোজা তাকালে অরোয়া অঞ্চল, অরোয়া  নালা শতধারায় বিভক্ত হয়ে অলোকানন্দায় মিশে যাচ্ছে। বাঁ দিকে কোনাকুনি উত্তরগঙ্গা উপত্যকা। সেখান থেকে ভাগিরথী হিমবাহ নেমে এসেছে। আর একদম বাঁ দিকে আমাদের আগামীকালের পথের কিছুটা দেখা যাচ্ছে। পথটা কিছুটা এগিয়ে বাঁ দিকের চক্রতীর্থ উপত্যকার দিকে চলে গেছে। ওই বাঁ দিকে থেকে নেমে এসেছে সতপন্থ হিমবাহ। আর ঠিক যেখানে সতপন্থ ও ভাগীরথী হিমবাহ মিলেছে, ঠিক সেখান থেকেই অলোকানন্দার উৎপত্তি। সূর্যদেব সামনের উঁচু পাহাড়ের আড়ালে গেলেন, আর উপত্যকায় সন্ধ্যার ছায়া নেমে এলো। কোথা থেকে সাদা মেঘের দল সামনের পাহাড়গুলোকে মেঘের চাদরে ঢেকে দিতে লাগলো। অন্ধকারের গায়ে আরও এক পোঁচ পড়লো। দূরে, উত্তরগঙ্গা হিমবাহ অঞ্চলের শিখরে তখন সোনারঙ লেগেছে। অন্ধকারে মনে হয় পাহাড়গুলো যেন একটু কাছে এগিয়ে এসেছে। হঠাৎ সেই মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। সেই পুণ্যবতী দুঃখিনী মা, একাকিনী এক পাথরের ওপর বসে আছেন। অলকানন্দার পাড়ে বসে আমার এই প্রাচীন, অর্বাচীন ভারতবর্ষের এক পরম্পরাকে বয়ে নিয়ে চলেছেন। কি অসীম সাহস, কে বলে নারী দুর্বল? মনে মনে সেই মন্দিরের আঙিনার সব ধুলো গায়ে মাথায় মাখি। চোখের জলে চৌকাঠের ওপর মাথা রাখি।

রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবি, কাল বেশি পথ নয়। তারপরেই দেখতে পাবো অলকানন্দার জন্মস্থান। সে পুণ্যস্থানও বটে। হঠাৎ পাহাড়ে গুমগুম গুমগুম শব্দ ওঠে। কাছ থেকে দূরে সে শব্দ প্রতিধ্বনি হতে থাকে। আমি উঠে বসি। সংগ্রামজি.....হাঁ দিদি, সাড়া দেয় সংগ্রাম, আমি বলি, ইয়ে ক্যা আওয়াজ আ রহা হ্যায়? কুছ নেহি, দিদি, আভালাঞ্চ হ্যায়, সো যাইয়ে। সে স্বর্গভূমিতে অভ্যালাঞ্চের গুমগুম শব্দ কেমন দুন্দুভির মতো শোনায়। তারপর থেকে থেকেই সেই দুন্দুভি বাজতে থাকে। তাঁবুর চেনটা খুলে বাইরে উঁকি দিই। আকাশে চাঁদ নেই। মাথার ওপর নক্ষত্রের নকশা কাটা আকাশ। আবছা আলোয় পাহাড়ে হেলান দিয়ে কুয়াশারা গল্প করে ।আমি কান খাড়া করি, ওরা চুপ করে থাকে। আবার কতক্ষন পর যেন ফিসফাস, বিষণ্নতায় ভরা। সেই অলীক নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে কার এক গুমরোনো কান্নার শব্দ। সেই ফিসফাসে একটু যেন উত্তেজনা, এই অলকার কথাই ধরো, জন্মের পর থেকেই বন্দিনী সে মানুষের হাতে। সারা পাহাড় জুড়ে লোভের ফাঁদ পেতেছে তারা। পাহাড়ী নদীদের বন্দি করছে, তাদের কোমল শরীর নিংড়ে বিদ্যুৎ তৈরি করছে, নিজেদের লোভের পূজায় নদীদের আহুতি দিচ্ছে। কি যন্ত্রনায় যে  নিষ্পাপ নদীগুলো কষ্ট পাচ্ছে। এ জীবনে ওদের আর মুক্তি মিলবে না। এই কান্নাটুকুই ওদের একমাত্র সান্ত্বনা। আবার সব চুপচাপ। .....কিন্তু একদিন, একদিন সব অত্যাচারীদের মতোই এদেরও চরম শাস্তি হবে, সেই আশাতেই তো অলকা এখনও বেঁচে আছে। ওর দুচোখে যে এখনও সমুদ্রের স্বপ্ন। কী শুনছি এসব? হায় ভগবান, এরা কারা? কিছু ক্ষুদ্র লাভের আশায় মানুষ, সমগ্র মানব জাতির জন্য কি ভয়ানক অভিশাপ কুড়িয়ে আনছে?

দিদি, উঠো, উঠে বসি। ভোর বেলা কখন যে চোখ লেগে গেল, ইয় লো চায়। চা খেয়ে হাঁটা শুরু করি। কালকের কথা গুলো মাথার মধ্যে ঘুরে ফিরে আসছে। পথ তো বেশি নয়, পথের নেশাটাই বেশি। অবশেষে পৌঁছে গেছি। অনেক নীচে দুই হিমবাহের সংযোগস্থলের সিংহদুয়ার খুলে হিমালয়পুত্রী অলকানন্দার শিশু ধারা তিরতির করে বেরিয়ে আসছে। হিমবাহ-মায়ের কোলে বসে সমুদ্রের পথের ঠিকানা জেনে নিচ্ছে সে। মায়ের আশীষ মাথায় নিয়ে ঐতো সে এগিয়ে চলেছে। সে জানে না, পথের ফাঁদের কথা। একটু পরেই সে সারা জীবনের জন্য বন্দি হয়ে যাবে, এটাই তার ভবিতব্য। মানুষ তার কৃত  পাপের কর্মফল স্বরূপ পৃথিবী থেকে একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, নিশ্চিতরূপে। এটাও ভবিতব্য। আমি দেখতে পাচ্ছি, হিমবাহ-মা তাকিয়ে দেখছেন তাঁর সন্তানের চলে যাওয়া, সে আর কোনোদিন ফিরবে না তাঁর কোলে। উজানে যে আর ফেরা যায় না।















বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০

এক মিলনগাথা !!

খেরকুটিয়া নদীর নীল জলে হাঁস চরে। দূরঘাট দিয়ে নৌকো যায়। নদীর অলস স্রোতে কচুরিপানার ভেসে আসা, ভেসে যাওয়া; আমি ভাবি, এই আমার দেশ, আবার দেশ নয়। আমাদের শহুরে দিশাহীন জীবনে এই দৃশ্য যেন কোনো পুরোনো বইয়ের ছেঁড়া পাতা।

হেমন্তের মাঠে ধান কাটার মনোরম দৃশ্য। পড়ন্ত  রোদে মহিলারা ধান কাটায়  ব্যস্ত। পুরুষরা সেই ধান-কাঁধে বাড়ির পথে। এই ধান থেকে চালে পৌঁছনোর রাস্তা বড় সোজা নয়। প্রথমে ছড়া থেকে ধান আলাদা করা, তারপর অনেক পথ পাড়ি দিয়ে তবে সে চাল হয়। সে যাই হোক, আসল কথা হলো, এই যে ধান  কাটা আর মাঠ থেকে বাড়ির উঠোন, এই চলনের ছন্দটা আমাকে একটা যেন আনন্দের আবেশ দিয়ে ঘিরছে। আমার আজ বিকেলের এই অলস অবসর আমাকে যেন পূর্বজন্মের স্মৃতি মনে করাচ্ছে।

লুইট নদী লোহিতের আদরের নাম; কেমন শান্তটি  হয়ে শুয়ে আছে। ছোট ডিঙি নিয়ে দিনের শেষে নদী হাতড়ে বেড়ায় গাঁয়ের মানুষ। দূরে  জাল পাতা। এক মেছোবক জলের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। নদীর চড়ায় দুটো শামুক ভাঙা পাখি। দাঁড়িয়ে আছি বাঁশের সাঁকোয়, একটু ঝুঁকে মাঝিকে সুধোই, কি পাইলা, মাঝি? আমার ওই টুকু নড়াতেই সাঁকোয় খচরমচর, নিজেকে সামলাই কোনোমতে।মাঝি হাসে, বলে, ভিনদেশি  দেখি, বাসা কইহানে? কলকাতা, অয়,পাইসি কয়খান বরিয়ালা। উত্তরবাংলায় বরোলি শুনেছি, বরিয়ালা শুনিনি। জিজ্ঞাসা করব, তার আগেই ডিঙি এগিয়ে গেছে নদী বেয়ে। 

আজ যাবো, মাজুলি। একা মানুষ, পথে এপাশ ওপাশ তাকাই। নিমাতি, নিমাতি, নিমাতি  শুনে এগিয়ে যাই গাড়ির দিকে। যাইবেন নাকি? হ্যাঁ, কমলাবাড়ি ঘাট। অ, কমলাবাড়ি, কৈ যাইবেন, মাজুলি? হ্যাঁ, কেউ থাহে? না।একা আইসেন? হ্যাঁ।বয়েন, বয়েন। ভিতরে ঢুকে বসি। গাড়ি চলে। বাজার ছাড়িয়ে পাড়া ছাড়িয়ে গাড়ি ধান ক্ষেতের মাঝ বরাবর পাকা রাস্তা দিয়ে ছুটে চলে। মাঠভরা পাকা ধান, হেমন্তের সোনালী রোদ সব মিলিয়ে যেন কেমন যেন নেশা লাগে। পৌঁছলাম কমলাবাড়ি নিমাতি ঘাটে। সামনে ব্রহ্মপুত্র, বিশাল ডানা মেলে শুয়ে আছে। দূরে তাকাই, যতদূর চোখ যায়, ধু ধু বালির চর। শুশুক লাফায়। টিং টিং টিং টিং, ওরে বাবা নৌকো ছাড়বে, তাড়াতাড়ি টিকিট কেটে নৌকোয় উঠি। গাড়ি, লরি সব নিয়ে সেই নৌকো চলেছে মাজুলি।

নৌকো ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে। নদীর বুকে পলি পড়ে চড়া। সূর্যের আলোয় চড়ার বালী চিক চিক করে। হঠাৎ কেন জানি বাবার কথা মনে পড়ে। দেশভাগের আগেই কর্মসূত্রে এপারে চলে আসা। কলকাতা শহর। আদি বাড়ি ছিল বরিশালে। সেখানে চেনা সুখ চেনা দুঃখের আটপৌরে জীবন। বাংলা দেশের কথা তারা কোনোদিনই ভুলতে পারেন নি। ছোট বেলা থেকেই আমরা সেই বরিশাল, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র শুনেই বড়ো হয়েছি। বাবা আজ আর নেই, কিন্তু আজও ওই বাড়ি সেই পূর্ব বাংলার গল্প বলে। আমরা কোনো দিনই বাংলা দেশে যাই নি, শুধু শুনে শুনেই এক ঘুঘু ডাকা ছায়ায় ঢাকা ছোট্ট গ্রামের ছবি মনে আঁকা হয়ে গিয়েছিল। আর ছিল এক নদী, তার নাম কীর্তনখোলা। এমন সুরেলা নামের নদীর নাম আর কখনও শুনিনি। সেই নামখানি মনের ভিতরে যেন একখানি নকশিকাঁথা হয়ে বিছিয়ে আছে। বাবার কাছে শোনা, শীতের দুপুরে কীর্তনখোলার জল জোয়ারের টানে প্রায় উঠোনে উঠে আসত। সেই সুপুরি নারকেল গাছে ঘেরে গ্রাম্য জীবন নদী আকাশ মানুষের সাথে এক অদ্ভুত বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। জেগে আছ, নাকি ঘুমোলে? কে ডাকে? চারপাশে তাকাই, না,কেউ তো নেই। ভাবনার সুর কেটে যায়। নদীর কোলে উঁকি দিই, চিনতে পারো আমায়? নদীর হাওয়ায় ব্রহ্মপুত্রের ইশারা। ডাকলে আমায়? কত কাল পরে দেখা। আমি আশ্চর্য হই, কি করে চিনলে আমায়? নদীতে কুলুকুলু, বলে, চিনি নি, শুনেছি। কীর্তন আমায় ডাক দিল যে। অবাক হয়ে বলি,তু মি ওকে চেনো? .........সে যেন শুনতেই পেলো না, কীর্তন তোমার শরীরের শিরা উপশিরায় বয়ে চলেছে, মনে, চেতনায় অবচেতনে সে তোমার সাথে জড়িয়ে আছে, বলে চলে সে। আমার চোখ জলে ভরে ওঠে, অজান্তেই। কিন্তু, তাকে তো আমি কোনো দিন দেখিই নি, ‘এইতো, এইতো আমি’ বলতে বলতে চোখ দিয়ে সে অঝোর ধারায় বেরিয়ে আসে, আমার ভিতরে মোচড়ের পর মোচড়, বুকের ভিতরের নকশিকাঁথায় টান পড়ে। কীর্তনকে বুকে পেয়ে হেমন্তের ব্রহ্মপুত্র খুশিতে কলকলিয়ে ওঠে, এইবার আমরা বেশ সবাই সবাই হলাম। নৌকো আপন মনে উজিয়ে চলে ব্রহ্মপুত্র বেয়ে...........মাজুলির দিকে। 

কবিতা ৮ ।

 সপ্তসিন্ধু পার করে লখিন্দর ফেরে ঘরে।সাথে করে  বিবিধ রতন। শঙ্খ বাজে, উলু দেয় এয়োতি, পুরজন। বাপ তার, চন্দ্র সওদাগর। লখার সাফল্যে মুখে তার  গো...