স্মৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
স্মৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২০

এক মায়ের কথা !

 

আজ আমি জাহাজে চড়েছি। হাঁ, সত্যি। সত্যিকারের জাহাজ। ছবিতে যেমন দেখি। বিরাট বড় জাহাজ। যাব পোর্ট ব্লেয়ার থেকে ডিগলিপুর। এবার ঠিক করেছি, গাড়িতে নয়. জাহাজে, জলপথে পৌঁছব ডিগলিপুর। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উত্তরতম বিন্দু, যেখানে বসতি আছে, আছে বন্দর।

হাঁ, যে কথা বলছিলাম। জাহাজে উঠব। আটটার মধ্যে হাড্ডো জাহাজঘাটায় উপস্থিত হলাম। রাত নটায় জাহাজ ছাড়বে। একপ্রস্থ টিকিট পরীক্ষার পর জাহাজঘাটায় প্রবেশের ছাড়পত্র পাওয়া গেল। সাড়ে আটটায় জেটিতে পৌঁছে দেখি সেই বিরাট জলযান আলোয় আলোকিত হয়ে আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। দুধ সাদা শরীর তার। সেই আলো শরীর বেয়ে পিছলে যাচ্ছে। আমার জীবনে প্রথম জাহাজে চড়া। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলি। প্রবেশপথের মুখে টিকিট পরীক্ষক। ছবিতে যেমন দেখি সেই রকম সাদা জামা পরা। টিকিট পরীক্ষা করে আমায় ছাড়পত্র দিলেন। আমি প্রথম, আমার জীবনে প্রথমবার, জাহাজে পা রাখলাম। বিরাট হলঘর। সারি সারি মালপত্র রাখার খাঁচা। আমার লটবহরের লট-টাকে সেখানে রেখে বহর তিনটে হাতে নিয়ে আমি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সামনে দেখা লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলাম আমার আস্তানার কথা। টিকিট দেখে বলল, আরও উপরে উঠে যান, সামনে ডাইনিং হল, ওর ভিতর দিয়ে বাঁ দিকে যাবেন। তারপর একটা সিঁড়ি আছে। একদম উপরে উঠে যাবেন। ওরে বাবা! এত সেই সুকুমার রায়ের “ঠিকানা” কবিতা। যাই হোক, কি আর করা, আবার উঠতে লাগলাম। পৌঁছলাম অবশেষে। সুন্দর ব্যবস্থা। দুটো সাদা বিছানা। একটা কাঁচ-লাগানো জানালাও আছে। সেখান দিয়ে বন্দরের আলো দেখা যাচ্ছে। সহযাত্রী কেউ নেই। জিনিসপত্র রেখে বাইরে বেরোই। চেয়ার নিয়ে বসি।

ছোটবেলায় রূপকথায় পড়েছিলাম রাজপুত্র সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে যেত। কিন্তু তখনকার রাজাদের নাকি জাহাজ ছিল না, তাই ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীর পিঠে যেত। আমার তখন মনে হতো আমিও সমুদ্র পেরিয়ে যাব। আর ব্যাঙ্গমাকে যদি না পাই তাহলে জাহাজে চড়ে সাগর পেরোব। কারণ, ব্যাঙ্গমাকে খোঁজা সে এক হাঙ্গামার ব্যাপার। রাত্রিবেলায় অন্ধকার বনের ভিতর যেতে হয়। তারপর গাছের তলায় রাত কাটাতে হয়। তারপর দৈববশে যদি সেই গাছের ওপর ব্যাঙ্গমার বাসা থাকে তবেই তার সাথে যোগাযোগ হবে। তার থেকে আমার জাহাজই ভাল।

সেই স্বপ্ন আমার কাছে ধরা দিয়েছে আজ। আর একটু পরেই জাহাজ ছাড়বে। ঐ যে ভোঁ বাজলো। পারের দিকে তাকিয়ে আছি। জাহাজ আস্তে আস্তে এগিয়ে চলেছে। ধীরে ধীরে ঘাটের আলোগুলো বিন্দুতে রূপান্তরিত হলো। ঘড়িতে নটা বেজে আঠারো মিনিট। সমুদ্রের হাওয়ায় শীতের আমেজ। কেবিনের দিকে পা বাড়াই।

ঘরে ঢুকে দেখি কার একটা ব্যাগ রাখা রয়েছে। ভাবি বুঝি অন্য কারো ঘরে ঢুকে পড়লাম। “ম্যাডাম, আমি কি আজ রাত এই ঘরে থাকতে পারি? আপনার যদি আপত্তি না হয় তো।” তাকিয়ে দেখি এক ভদ্রলোক আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন। সঙ্গে দুজন দেহরক্ষী। তাদের মধ্যে একজন সবিনয়ে বলতে লাগলো তাদের সাহেবকে হঠাৎ যেতে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়েই তিনি ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি আর কি করি। অগত্যা ‘তাহলে থাকুন’ বলে জিনিসপত্র সরিয়ে রাখি। ভদ্রলোক অতীব ভদ্রলোক। নিজেই পরিচয় করলেন। জানা গেল তিনি ভারতীয় নৌসেনার পাইলট। বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তিনি কর্মস্থানে ফিরছেন।

ভোঁ—উঠে   পড়লাম। মায়াবন্দরের যাত্রী নামানোর সময় হয়ে গেছে। সমুদ্রের উপরে সূর্যোদয় হলো। জাহাজ আবার ঘাট ছাড়ল। আরেক ঘাটের উদ্দেশ্যে। আমি আবার ঘরে ফিরলাম। পাইলট সাহেব ততক্ষণে উঠে পড়েছেন। ‘গুড মর্নিং’ বললেন। তারপর আমাকে জাহাজ ঘুরিয়ে দেখাবেন বললেন। আমার তখন আনন্দ দেখে কে! পিছন পিছন চললাম। প্রথম নিয়ে গেলেন ডেকে। প্রতিটা যন্ত্র, মাস্তুল—তার ওপরের আলো। দড়ি, লাইফ-জ্যাকেট, লাইফ-বোট কোথায় থাকে। কিভাবে ব্যবহার করতে আপতকালীন সময়ে, সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলতে লাগলেন। তারপর নিয়ে গেলেন জাহাজের প্রাণকেন্দ্রে। যেখান থেকে জাহাজ চালনা করা হয়। কম্পাস, প্রাচীনকাল থেকে নাবিকরা নৌচালনার সময় যে পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, এখনও সেই মূল নিয়ম মেনেই জাহাজ চালনা করতে হয়। যন্ত্রপাতি অত্যাধুনিক, কম্পাস অত্যাধুনিক, কিন্তু বিদ্যুত বিভ্রাট হলে পুরোনো কম্পাসই ভরসা। কাপ্তেন সাহেব এসে আলাপ করলেন। উনি সব ঘুরিয়ে দেখানোর পর চা খাওয়ালেন। সেই সব করতেই সময় পার। দূর থেকে আমার ঘাট দেখা গেল। সবুজের, গাঢ় সবুজের আস্তরণের মাঝে একটুখানি ফাঁকা। ওই খানেই তো আমি নামব।

‘দিদি, এদিকে’—বিশুদ্ধ বাংলায় ডাক শুনে পিছন ফিরে দেখি ‘দীপঙ্কর’, আমাকে নিতে এসেছে।

পৌঁছলাম গিয়ে আমার চারদিনের আস্তানায়। এবার কেন এসেছি বলি। দূর, বহুদূর পৃথিবীর আরেক প্রান্ত থেকে কিছু অতিথি এই সময় আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কিছু নির্জন সমুদ্রতটে আসে। কেন আসে? মা হবে বলে। হাঁ, ঠিক ধরেছেন। কিছু বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রতি বছর হাজার হাজার মাইল পার হয়ে এই ভারতবর্ষের মাটিতে ডিম পাড়তে আসে। মূলত পাঁচটি প্রজাতি। গ্রিন টারটেল, হক্সবিল, লেদারব্যাক, অলিভ-রিডলে এবং লগারহেড। তারা আসে, ডিম পাড়ে এবং ফিরে যায়। তারা জানে না তাদের বাচ্ছারা সবাই ফিরতে পারবে কিনা। কিভাবে পথ চিনে তারা তাদের মা-বাবার কাছে ফিরে যাবে। অদ্ভুত এক প্রাকৃতিক নিয়মের ক্রীড়নক তারা। প্রকৃতি কার জন্য কি নির্ধারন করেছে কেউ জানে না। আমি এসেছি সেই কচ্ছপ-মায়েদের সাথে দেখা করতে।

সমস্ত সমুদ্রতটে এখন জরুরী অবস্থা চলছে। পর্যটকরা রাত্রে বিশেষ কিছু সমুদ্রতটে  যেতে পারবেন না। কারণ, ভয় পেলে সেই বিশেষ সময়টুকুর ব্যবহার না করতে পারলে সেই আসন্ন প্রসবা কচ্ছপ-মা অসহায় হয়ে পড়বে। বিশেষ সময় বলছি তার কারণ আছে। অনেকগুলো শর্তের ওপর এই প্রসব করা নির্ভর করছে। দিনের বেলায় এই ঘটনা ঘটেই না। ঘটলেও তা প্রায় বিরল ঘটনা বলে গণ্য হয়। রাত্রিবেলা সমুদ্রে ভরা জোয়ারের সময় এই মা কচ্ছপরা জল ছেড়ে বলিয়াড়িতে উঠে আসে। তারপর নিজে পছন্দ মত জায়গায় বালি খুঁড়ে তার ভিতরে ডিম পাড়ে। এক সাথে প্রায় একশো দেড়শো ডিম পাড়ে।তারপর আবার বালি চাপা দিয়ে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে আবার সমুদ্রে ফিরে যায়। যাবার সময় আর পিছন ফিরেও দেখে না। প্রকৃতির কি অদ্ভুত নিয়ম। অনাগত সন্তান তার, অজানা পরিস্থিতিতে, নিষ্ঠুর সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তার মায়ের সাথে দেখা করবে বলে আবার সমুদ্রগামী হবে। এই সমস্ত ঘটনা ঘটতে মাত্র একঘন্টা থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। ভরা জোয়ারেই মাকে আবার সমুদ্র ফিরে যেতে হবে।

এর পরের ঘটনার সাক্ষী হতে আমার এইবারের আন্দামান যাত্রা। সময় আর কাটে না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। বিকেলে একবার ঘুরে এসেছি সমুদ্রের ধার থেকে। সমুদ্রও শান্ত। শুধু হাওয়ায় হাওয়ায় ফিসফাস। তারা আসছে, তারা আসছে। শুনে ছিলাম এই প্রজাতির কচ্ছপরা যেখানে জন্মগ্রহণ করে তার নিজেদের প্রসবের সময় সেখানেই ফিরে আসে। এটাই পরম্পরা। আবহমানকাল এই নিয়মের অনুসারী তারা। প্রসবের পর কাঁদতে কাঁদতে মায়েরা ফিরে যায়। ভাবতে ভাবতেই মন ভারী হয়ে ওঠে। গলার কাছে কি একটা দলা যেন আটকে যায়। আপনিই চোখ আমার জলে ভরে ওঠে।

মূলত, অস্ট্রেলিয়া থেকে এই কচ্ছপরা আসে। শিশু জন্মানোর পর বাচ্ছাদের খোলের উপর বনদপ্তরের কর্মীরা অস্ট্রেলিয়ার ছাপ লাগিয়ে দেয়। যে কচ্ছপরা আসে তাদের পিঠের খোলের উপর অস্ট্রেলিয়ার ছাপই এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

রাত সাড়ে নটা নাগাদ আমি তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঈশ্বরকে স্মরণ করলাম। এমন এক মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি যে মা নিশ্চিন্তে তার সন্তানের দায়িত্ব প্রকৃতি মায়ের হাতে ছেড়ে দিতে পারে।

সমুদ্রের ধারে হাওয়া বইছে। আকাশ তারায় ভরা। জোয়ার এসে গেছে। জলের কুলু কুলু ঢেউ এখন ছলাৎছল বলছে। বনকর্মীরা সবাই সমুদ্রতটে ছড়িয়ে পড়েছে। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। সময় আর কাটে না। আসবে তো? তার সাথে দেখা হবে তো আমার? পৌনে এগারটার সময় সবাইকে পিছনে সরে যেতে বলা হলো। এসেছে, সে এসেছে। দুটো মোবাইলের টর্চের আলোর বিন্দু তার পাশ দিয়ে চলেছে। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে আসছে। অত পথ পাড়ি দিয়ে সে এসেছে শুধু তার সন্তানের জন্ম দিতে। আসন্ন প্রসবার প্রসব যন্ত্রনাও শুরু হয়েছে হয়তো। এক সময় সে থামে। আমি দম বন্ধ করে বসে আছি। এক জাগতিক সত্যের অপেক্ষায়। অবশেষে এল সেই মুহূর্ত। সে প্রথম ডিম দুটো প্রসব করল। হাঁ, এক সাথে দুটো করে ডিম। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আমার। আমি প্রকৃতির এই চরম রহস্যের সাক্ষী হয়ে থাকলাম। বন দপ্তরের কর্মীরা পিছন দিক থেকে বালি সরিয়ে দিচ্ছেন। আমি ধীরে ধীরে মায়ের মুখের ঊপর হালকা আলো ফেললাম। মায়ের মুখ গর্বে ভরে উঠেছে। প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ আস্বাদনের আনন্দে সে মুখ আলোকিত। তার দু-চোখের কোণে ঐ কি চকচক করছে? ধীরে তার পিঠের ওপর হাতটা রাখলাম। মাথাটা উপর দিকে তুলে দুবার সে ঢোঁক গিলল। গলা থেকে তার কি এক শব্দ হলো। হয়তো ঈশ্বরের কাছে সন্তানসকলের মঙ্গল কামনা করলো। হয়তো সদ্যজাতককে ছেড়ে যাওয়ার অসহ্য ব্যথা জানালো অথবা ঈশ্বরীয় নিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করল। জানিনা, তার চোখের জল আমার মাতৃসত্বাকেও ছুঁয়ে গেল। খোলা আকাশের নীচে সেই মায়ের সাথে আমিও কাঁদতে লাগলাম। তারপর আমার অবচেতনায় যেন শুনতে পেলাম, ‘আমি মা হয়েছি’।

তার ডিম পাড়া শেষ হয়ে গেছে। সে ফিরে যাচ্ছে। না, একবারও পিছন ফিরল না সে। ধীরে ধীরে প্রসবের ক্লান্তিকে সাথী করে, মা হবার গর্বে, আনন্দে তার ভাবীকালের সন্তানকে প্রকৃতি মায়ের হাতে সঁপে দিয়ে সে এগিয়ে চলেছে সাগরের দিকে। যে পথ দিয়ে তার সন্তানেরা তার যাত্রা সম্পূর্ণ করবে।

শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২০

ব্রতকথা !

 

আজ দিনটা খুব গরম ছিল। বিকেল বেলায়  ছাদে ওঠা এখন  প্রায় অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। গরমের জন্য আজ একটু দেরীতেই ছাদে উঠলাম । গিয়ে দেখি দিনমনি আজকের যবনিকাপাতের সব অনুষ্ঠানই সম্পূর্ণ করে ফেলেছেন প্রায়। পাখিও আর ডাকছে না। সূর্যাস্তের আর বিশেষ বাকি নেই। পৃথিবী শান্ত হয়ে এসেছে। সাত অশ্বের রথ মর্ত্যলোকের সীমা পার করে মেঘ রাজ্যে ঢুকে পড়েছে । ঘোড়ার ক্ষুরের আঘাতে মেঘগুলো ছোট ছোট টুকরো হয়ে যাচ্ছে । সেই রথের পাশ কাটিয়ে সন্ধ্যা নামছে ধীরে। আমি সেই দিকেই তাকিয়ে আছি। সামনে দিয়ে একা এক পাখি উড়ে গেল। সেই রথের উপর থেকে তিনি হাত নাড়ছেন। আমিও হাত জোড় করে তাঁকে প্রনাম জানাই। আজকের মত বিদায়। সেই টুকরো হয়ে যাওয়া মেঘগুলো আবারও হাত ধরাধরি করে এক হয়ে গেছে। এই দৃশ্যপটের ওপর তারা যবনিকা টেনে দিলো। এক মহাজাগতিক দিনের অবসান ঘটলো। 

এই রেশ টুকু যেন আর কাটতে চাইছে না। মন বলছে যেন এখানেই শেষ নয়, আরো কিছু আছে, আরো কিছু.........। এক ব্যথা বহুকাল, সে যে কতকাল, সে আর এখন মেপে বলতে পারি না, বয়ে নিয়ে চলেছি। সে ব্যথা একান্ত আমার। তাকে রাখি এমন আধার এই পৃথিবীতে নেই। অত্যন্ত মূল্যবান সে ব্যথাটুকু বর্তমানে আমার সম্পদে পরিণত হয়েছে। তাকে অতি যত্নে অন্তরের গভীরে, সেই যেখানে একটি দীপ অনির্বান শিখায় জ্বলছে, সেই আলোটির পাশেই রেখেছি। সেই শিখাটির আলো ছাড়া যে এই ব্যথার অস্তিত্ব অনুভবেই আসবে না

তারপর সেই কত রাতের বেলায় চারপাশের আঁধার চিরে বিদ্যুৎ চমকায়। গুরু গুরু সারা আকাশ জুড়ে বাজতে থাকে। সেই বিপুল উৎসবের সাক্ষী হয়ে প্রকৃতি আনন্দে আত্মহারা। গাছেরা আনন্দে লুটোপুটি খাচ্ছে। গাছে গাছে পাখির ডাক, সময়কে অকালে জাগিয়ে, প্রকৃতিকে আনন্দে মাতিয়ে অশুভকে সন্ত্রস্ত করে তার এই উপস্থিতি আমার সত্তাকে প্রান প্রাচুর্যের ধারায় ভরিয়ে তোলে। আমার সত্তা জেগে ওঠে। চারপাশের সকল ভাঙ্গনের শব্দে, অনুভবে যে বিশ্বাসের জোর অবিশ্বাসের পাঁকে চাপা পড়ে গিয়েছিল, সেই পাঁক সরে গিয়ে আবার, আবারও একবার সকল শুভ ইঙ্গিত ঝলমলিয়ে উঠলো। সেই প্রলয় ছন্দে অন্তরের দীপশিখাটিও কেঁপে উঠলোআজ এই মধ্যরাত্রের প্রলয় যাপনে রবি ঠাকুরের সেই কথাটি মনের ওপর দিয়ে বয়ে গেল, আর সকলেরে তুমি দাও, শুধু মোর কাছে তুমি চাও। এই মরুজীবনের পথে কত বার কত রূপে এসেছ এই ব্যথাটুকু হরণ করতে। তোমার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছো, বিনিময়ে চেয়েছো এই ব্যথাটুকু। না, কোনো প্রলোভনেই এই বিনিময় পূর্ণতা পায় নি। আজ তুমি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছো যে এ ব্যথা নিতান্তই আমার। তুমি ব্যর্থ হয়েছো। এই ব্যথাব্রত সাধনার আমিই সাধক। আর তাই, বারবার ফিরে ফিরে আসো আমার সাধনার তপোমন্দিরে। অতি যত্নে সুকোমল হাতে সব দুঃখ মুছিয়ে দাও। কিন্তু দুঃখের চিহ্ন মুছে দেওয়া, সে বোধহয় তোমারও সাধ্যের বাইরে। এক্ষেত্রে তোমারও সীমা নির্ধারিত করা আছে। জীবনের দুঃখকাল সময়ের সাথে অতীত হয়, কিন্তু দুঃখকালের স্মৃতি? সে শুধু ব্যথাই বয়ে আনে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তোমার নিজের হাতে যে দুঃখ দান করেছিলে আমায়, এতদিন পরেও কি সেকথা ভুলতে পেরেছো? আজ তোমার ব্যথাও সীমাহীন। এ ব্যথা তোমারও যাবার নয়। তাই তো আজ মন্দিরে আমার সাথে তোমারও আসন পেতেছি। একসাথে আজ দুজনেই এই ব্যথাব্রত উদযাপন করবো

এসো..................

বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২০

নদীর উজানপথে !

বিজ্ঞান বলেএই পৃথিবীতে সবই নাকি আছেশুধু খুঁজে নিতে হবে। বেশ কথা। কিন্তু কি খুঁজবোকবি বলেছেনখ্যাপা পরশ পাথর খোঁজেঅর্ধেক জীবন ব্যয় হয়ে যায় তারকোনো এক সময় পেয়েও শুধুমাত্র না চিনতে পারার জন্য আবার হারিয়ে যায়। জীবন সায়াহ্নে এসে সে উপলব্ধি করে যে আবার তাকে পুরোনো পথেই ফিরে যেতে হবেকারণ ওই পথেই সে অসাবধানে সেই অমূল্য রতনটি ফেলে এসেছে। ঠিক এই খানেই সেই অমোঘ প্রশ্নটি মনে জাগেসময় পাওয়া যাবে কিকে জানে.......

আসলে আমরা সবাই সর্বক্ষণই কিছু না কিছু খুঁজে চলেছি। তাই নাআমিও তার ব্যতিক্রম নই। আমিও খুঁজে চলেছি। শহুরে জীবনের বিস্তর খোঁজাখুঁজির মাঝে জীবনটাই হারিয়ে গেছে। এখন বেঁচে আছির বদলে টিকে আছি বললেই বোধহয় সত্যটুকু সুবিচার পায়

বেশিদিন বাড়িতে থাকতে পারি না। দমবন্ধ লাগে। সময় সুযোগ বুঝে হরিদ্বার যাওয়ার টিকিট কাটি।.....ভোরেরবেলায় ট্রেন থেকে নেমে হোটেলে যাই। তারপর স্নান সেরে সোজা হর কি পৌড়ি ঘাটে।...দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি কত মানুষভোর থেকেই পুণ্যার্থীসাধুভবঘুরে সবাই একঠাই। কেউ শীতল হয়কেউ পুন্য মাপে। আর কত যে ভিখিরিকেউ গেরুয়া বসনেকেউ ছিন্নবস্ত্রে। এই ভারতবর্ষে যুগে যুগে গঙ্গার ধার বরাবর এই ভিক্ষাকর্মীদের এক চলমান জীবনযাত্রা। সে বিশ্বনাথের কাশীই হোক অথবা এই হরিহরের দুয়ারএর কোনো পরিবর্তন নেই। রোদ বাড়েআমি ফেরার পথে ধরি সন্ধ্যার আগে আবার আসি। একটু পরেই আরতি শুরু হবে। ধীরে ধীরে আরতি দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে। আরতি শেষে যে যার ঘরে ফিরে যায়। শেষ সন্ধ্যায় ঘাটেরও ক্লান্তি আসে। পাহাড়ের হাওয়ায়গঙ্গার কুলু কুলু ঘুমপাড়ানি গানে ঘাটও একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। বসে আছি ঘাটের কিনারায়নদীর জল ছুঁয়েএই সময় অনেক পুরোনো কথা মনে আসে। জলে ফাঁড়া ছিল বলে ছোট বেলায় জলের কাছে যাওয়া বারণ ছিল। আজ নদীর জল ছুঁয়ে বসে আছি। কেউ আর নিষেধ করার নেইসবাই আজ আকাশের তারা হয়ে গেছে। হয়তো সেখান থেকেও বারণ করছেকে জানে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। চাঁদের হালকা আলো নদীর শরীরে ছায়া জড়ায়সেই অন্ধকারেনদী পাশ ফিরে শোয় ওপারের দোকানগুলোর আলো সব নিভতে শুরু করেছেএবার ফিরতে হবে। নদীকে বলিকাল আবার আসবোকেমনএই আমার এক রোগসবার সাথেই কথা বলি। পিছন থেকে কে যেন টেনে ধরেএকবার আমার উজানে যাবেআমার ছোট বেলার খেলাঘর। পিছন ফিরিকই কেউ না তোশুধুই কুলু কুলু কুলু কুলু......... মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়উঠে পড়ি। প্রথম বাসটাই ধরবো ।.....

বাসে উঠে একটা জানলার ধারে জায়গা পেলাম। বাস চলতে শুরু করতেই না ডাকতেই ঢুলুনি এলোজলদি উতরোঘুম ভেঙে যায়ব্যাসী পৌঁছেছি। আলুর পরোটা আচার দিয়ে খেয়ে আবার নিজের জানলার ধারে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। স্কুলের পোশাক পরা ছোট ছেলেরা স্কুলে যাচ্ছেকোথাও বা রাস্তা তৈরি হচ্ছে। কোথাও  পাহাড় থেকে নেমে আসা ধারায় দৈনন্দিন কাজ সারছে গ্রাম র মানুষ। হিমালয়ে সাধুবাবারা হেঁটেই চার ধাম দর্শন করেনতাঁরাও হেঁটে চলেছেনহাতে কমন্ডলুপিঠে এক ঝোলা। মাঝে মাঝে বাস দাঁড়াচ্ছেদুচার জন নামছেকেউ বা উঠছে। এই হলো হিমালয়ের পথে যাত্রার চলমান ছবি

এসে গেলাম দেবপ্রয়াগ। ভাগীরথী আর অলকানন্দার বিবাহ স্থল। ওপর থেকেই দুজনার হাতে হাত রেখে চিরজীবন সাথে চলার অঙ্গীকারের চিরপরিচিত ছবিটি বেশ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়ে হরিদ্বারের ঘাটে র কথা। গঙ্গা তো এক ধারা নয়তিন ধারা মিলিত হয়েছে। এখন কি করিঅবশেষে ঠিক করলাম অলকানন্দার উজানেই যাবো। রুদ্রপ্রয়াগে আজকের যাত্রাপথের বিরতি

আজ জসীমঠ যাবো। গাড়োয়ালের সব শহর গুলোতেই অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কুফল ফলতে শুরু করেছে। এ পথের দূরত্বও অনেক। সারাদিন ধরে চলে নন্দপ্রয়াগকর্ণপ্রয়াগ সব পার করে  চলেছি। চায়ের বিরতি। গাড়ি থেকে নাম হলো  উল্টো দিকে তাকিয়ে দেখি এক বড় পাহাড়ি নালাতাকে নালা না বলে নদী বলাই ভালোডানদিকের এক উপত্যকা থেকে নেমে এসেছে। কি নাম ভাইতোমারতার উচ্ছলতা অবাক করে আমায়। আমার নাম বিরহী গোবিরহী। আমি একটু ঠাট্টা করে বলিকিসের বিরহ তোমারআর বিরহে বুঝি কেউ নাচেসে নুড়ির নুপুর বাজিয়ে এক  পাক নেচে নিলো। এক দমকা হাওয়ায় গাছ থেকে কত পাতা যেন ঝরে পড়লো। আমার  দিকে তাকিয়ে বললকোন দেশ থেকে এসেছ তুমিবিরহই তো নাচের উৎস। না হলে শুধু শুধু কেউ নাচেআমাদের দেবাদিদেব মহাদেবতাঁর স্ত্রী সতীর বিরহে কত কেঁদেছেনতারপর সেই প্রিয়দেহ বুকে নিয়ে যে ছন্দে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছিলেনসেটাই তো নাচ। সেই নাচের তালে পৃথিবী কেঁপে উঠেছিলদেবতারাও জেগে উঠেছিলেন। আহাকতদিন আর অমন নাচ দেখিনাবলতে বলতে সে উদাস হয়ে গেল। কতক্ষন সে চুপ করে রইলোতারপর যেন আপনমনে বলতে লাগলোতাঁর তো সেই শোকের আর বিরাম হলো না। তিনি তো এখনো কেঁদেই চলেছেন। সে অশ্রু ধারাই তো আমার উৎস। তাই তো আমার নাম বিরহী। সেই দুঃখ ধারা আমি যুগে যুগে বয়ে নিয়ে যায় সাগরেতা নাহলে এই হিমালয় পর্বত কবেই তলিয়ে যেত। আমি হাঁ করে শুনছিহঠাৎ সম্বিৎ ফেরে তারবলেদেখলে তো কত দেরি করিয়ে দিলে আমায় সরো দেখিপথ ছাড়োবলতে বলতেই ছুট দিলো। সেই বিরহের ছন্দ আমার প্রাণের গভীরেও কি এক ব্যথার মূর্ছনা জাগায়। আবার গাড়ি চলে। অবশেষে জসীমঠ পৌঁছলাম। প্রায় চারটে বাজে। আজ এখানেই থাকবো। কাল প্রথম গেট ধরে বদ্রিনাথ যাবো। রাতের আলো ঝলমলে জসীমঠ ভারী সুন্দর। অনেক নীচে অলকানন্দার স্রোতকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে। সেই কর্মকান্ডের আলোয় সারা পাহাড় আলোকিত। চাপা এক কান্নার আওয়াজকে যেন গুমরে গুমরে কাঁদছে?

ভোরে উঠে মন্দিরে প্রনাম করে বদ্রীনাথ মার্গে দাঁড়িয়ে আছি। আজকের গন্তব্য বদ্রীনাথ হয়ে মানাগ্রাম । এই গ্রামটি এই পথের শেষ জনপদ। এর পর আর কোনো জনবসতি নেই। এই জসীমঠ থেকে বদ্রীনাথ পঞ্চাশ কিলোমিটার রাস্তা। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম। কি ভিড়ভক্তদের। ভক্তছাড়া ভগবান অচল। একটু এগিয়ে ঝোলাপুল পার করলেই স্বয়ং বদ্রীবিশালের দরবার। নীচ দিয়ে বয়ে যায় অলকানন্দার ধারা। এককাপ চা খেয়ে মানাগ্রামের গাড়ি ধরি। গ্রামে পৌঁছে স্থানীয় পঞ্চায়েতের সাথে কথা বলে তাঁবু লাগাই। সব ব্যবস্থা করে পায়ে পায়ে ভীম পুল পার করে  এগোই। এই পথ সোজা চলে গেছে বসুধারা প্রপাতের পায়ের কাছে। সরস্বতী মন্দিরের পাশ থেকে সগর্জনে বেরিয়ে আসছেন মা সরস্বতী। প্রবল শব্দে কান পাতা দায়  কোথায় সেই শ্রীপঞ্চমীর শান্তশিষ্ট  রূপের  ঠাকরুনটিএকী ভয়ঙ্কর রূপ তারবুকের ভিতর কেঁপে ওঠে। এত শব্দে পাশের লোকের কথাই শোনা যায় নাতো আমার বিড়বিড় করে চাওয়া তিনি শুনবেন কি করেমরিয়া হয়ে প্রানপনে চিৎকার করে বলিবিদ্যা দাও। কি যে আশীর্বাদবানী উচ্চারিত হলো বলতে পারি না। বাঁদিকে অনেক নীচে গিয়ে সেই ধারা অলকানন্দায় মিশে যাচ্ছে। সেই মিলনস্থল কেশবপ্রয়াগ নামে পরিচিত। দেখতে দেখতে উপত্যকায় সন্ধ্যা নামে  আর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রকৃতির আঙিনা তারার আলোয়  আলোকিত হয়ে উঠবে। বদ্রীনাথের শয়ন আরতিও হয়তো শুরু হয়েছে। কেশবপ্রয়াগের পুলের অপর পারে হালকা এক পথের নিশানাআগামীকাল ওই পথ ধরেই আমি যাব। ওই অস্থায়ী কাঠের পুলটিই এপারের সাথে ওপারের একমাত্র যোগাযোগকারী সূত্র। ফী বর্ষায় অলকানন্দা ওকে ভাসিয়ে নেয়ওর চোখেও তখন অলকানন্দার মতই সাগর মিলনের স্বপ্নকিন্তু কোনোদিনই সে সাগরে পৌঁছয় না। নদীর কোন বাঁকে যেন আটকে পড়ে। পাহাড় বড়ো মায়ায় তাকে পিছনে টেনে রাখে। নিকষ অন্ধকার নেমে আসছেপাহাড়ের উপত্যকায়। সেই অন্ধকারে কে কাঁদেখুব চাপা অথচ খুব স্পষ্টসে গুমরানো কান্না। সেই কান্না যেন পাহাড়ের অন্দরে ঘুরে ঘুরে মুক্তির পথ খুঁজে বেড়ায়। সরস্বতীর উদ্দাম গর্জনের সাথে মিশে সে গুমরানো কান্নার আওয়াজ সেই অন্ধকার রাতে কি এক আসন্ন মহাবিপদের সূচনা চিহ্নিত করে চলেছে

সকাল হয়। চারপাশে ছোট পাখির কলতান। উঁচু উঁচু সাদা মাথার বৃদ্ধ পাহাড়ের সারিহাসিমুখে স্বাগত জানায়কুশল জিজ্ঞাসা করে। তাঁদের প্রনাম জানাই। সূর্যের আলো তাঁদের আশীর্বাদ বয়ে আনেসেই  স্পর্শ আমায় পুন্যাঙ্গ করেশিহরণ জাগায়। আসলে হিমালয় দেবভূমি। সমগ্র হিমালয় অঞ্চলই সেই প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত পুণ্যব্রত  মহান ঋষিদের তপস্যা ভূমি। সেই তপস্যার পূতফল সেখানকার আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে আছে। আমায় যেতে হবে সত্যের পথ ধরে সেই পুন্য সলিলার আঁতুড় ঘরেযেখানে যেতে গেলে শরীরের সাথে সাথে মনের  শুদ্ধতার আবশ্যিকতাও বাধ্যতামূলক। সব গোছগাছ করে বেরিয়ে পড়লাম। অনেকটা পথ আজ হাঁটতে হবে তাই আমার পথ প্রদর্শক সংগ্রাম সিংকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। সোজা উৎরাই পথে কালকের দেখা কাঠের পুলটার কাছে নেমে আসি তারপর সেই পুলটা পার করে ডানদিকের চড়াই পথ ধরে এগোতে থাকি। খানিক এগিয়ে পশ্চিমমুখী পথের বাঁপাশে এক ছোট্ট মন্দির। মূল পথ ছেড়ে পায়ে পায়ে উঠে আসি মন্দিরের চাতালে। চারপাশ তাকিয়ে দেখিজনবসতির কোনো চিহ্নই চোখে পড়ে না। মন্দিরটিও তালা বন্ধ। একটু হতাশ হই। পাহাড়ে সূর্যের তেজ খুব চড়া । জল খেয়ে সংগ্রাম কে জিজ্ঞাসা করি। সংগ্রাম বলতে থাকে। সেই কবেকার কথা। নর ও নারায়ণ নামের  দুই ঋষি এই বদরিকা আশ্রমে এসে নারায়ণের তপস্যা শুরু করেন। সেই দুই ঋষির অভাগিনী মা শুধু সন্তানদের চোখে দেখতে পাওয়ার আশায় সেই স্থানে এসে ঘর বাঁধেন। আমি যেন সেই যুগে পৌঁছে গেছি। সেই পাণ্ডববর্জিত পাথরের সমুদ্রে এক মা শুধুমাত্র পুত্রমুখ দর্শনের ইচ্ছায় সেই ভীষণ স্থানে যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করছেন। কথিত আছেবছরে এক বিশেষ দিনে তিনি দুই পুত্রের দর্শন পান। প্রত্যেক বছর শ্রাবনমাসের দ্বাদশী তিথিতে (যা বামন দ্বাদশী নামে পরিচিত) বদ্রীনাথ থেকে তাঁর দুই পুত্র ডোলিতে চেপে মাতৃদর্শনে আসেন। সেই দিনটি সেই মায়ের জন্য সবচেয়ে আনন্দের দিন।সেই উপলক্ষ্যে ঐ দিন মন্দির চত্ত্বরে বিরাট মেলা বসে। তারপর ঋষিদ্বয় আবার বদ্রীনাথে ফিরে যান। আর সেই স্নেহপরায়না মাতৃহৃদয় একাকী সেই ভীষণ বিপদসংকুল প্রদেশে আবার এক বছরের জন্যে সন্তানদের প্রিয়মুখ দর্শনের আশায় অপেক্ষায় বসে থাকেন। সেই জন্য মন্দিরটি মাতৃ মূর্তি মন্দির নামে পরিচিত। শুনতে শুনতে আমার চোখের জল আর বাধা মানলো না । এক আশ্চর্য উপলব্ধি হলো। ঈশ্বর কি এমন বস্তু যার জন্য মাকে এত কষ্ট দেওয়া যায় আর সন্তান কি এমন বস্তু যে যার জন্য পৃথিবীর সব কিছু ত্যাগ করা যায়এই নিষ্ঠুরতার অনুষ্ঠানের একমাত্র সাক্ষী সেই ঈশ্বরযার উপাসনায় পুত্রেরা মাকে এত যন্ত্রনা দিচ্ছে। এই কথাগুলো যত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়া যায়ততই ভালো। নিদারুন  মানসিক যন্ত্রনায় এই ব্যথাতুর মানব হৃদয়সেই ঈশ্বর আর তাঁর উপাসকদের প্রানভরে অভিশাপ দিলো। তারপর নিজের চোখের জলে মায়ের মনের ব্যথার উপশমের চেষ্টায় মন দিলো। সন্তানের নির্মমতায় মা যে পাথর হয়ে গেছেন। সন্তান আর সন্তাপের মানে কি একদিদিদিদি উঠোমত রোও ইতনাচলোবহত দূর যানা হ্যায়। সংগ্রামের ডাকে যেন স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। কী এক অসহ্য যন্ত্রনা থেকে পলকে মুক্তি পেয়ে বাস্তবে ফিরি মাতৃমন্দিরে সাষ্টাঙ্গে প্রনাম করে পথে নামি। দূর থেকে ডানদিকে বসুধারার স্বর্গীয় ধারা দেখা যাচ্ছে। ঐ ধারাজল সারা ভারতের তপস্যাব্রতীদের বড় সাধনার ধন। কথিত আছে যেপাপী শরীরে ওই জল স্পর্শও করে না। সামনে এক ভাঙাচোরা হিমবাহের ফুটিফাটা পাথুরে অঞ্চল। ঝুরঝুরে পাথর আর বালি মাটির এক বিপদজনক সংমিশ্রণ। ওর ওপর দিয়েই আমাদের রাস্তা। সাবধানেধীরে ওই চড়াইটা পার করে ওপরে উঠে আসি। ডানদিকের খাতে হিমবাহের হাঁ মুখ দিয়ে অলকানন্দা বেগে বেরিয়ে আসছে। এরপর খালি চড়াই আর চড়াই। সাবধানে বোল্ডারের ওপর দিয়ে দিয়ে এগিয়ে চলেছি। পথের অপরূপ সৌন্দর্যবর্ণনার অতীত। ফুলে ফুলে উপত্যকা ভরে আছে। আর হবে নাই বা কেনএ পথ যে স্বর্গের পথসত্যের পথ। এই পথ দিয়েই তো যুধিষ্ঠির সপরিবারে মহাপ্রস্থান করেছিলেন। সমগ্র মহাভারতের মধ্যে এ এক অপূর্ব অধ্যায়। কী উন্নত দার্শনিক চিন্তার সমন্বয়তুমি যেই হওসময় ফুরোলে নিঃস্ব  হয়ে একাকী এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। পিছন ফিরে দেখা চলবে না। এই দার্শনিক চিন্তার এই রকম অপূর্বতুলনাহীন প্রয়োগ আর সারা পৃথিবীতে কোথাও নেই। এই একটি মাত্র পথযা স্বর্গারোহনের পথ হিসাবে চিহ্নিত। এই পথ ঈশ্বর উৎসর্গ করেছেন মানব জাতির উদ্দেশ্যেযে মানুষ নিজেকে ওই স্তরে উন্নীত করতে পারবেওই পথে তাঁরই অধিকার। ভাবতে গিয়ে সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আবারও এগিয়ে যাই। খানিক এগিয়ে একটা সমতল মতো জায়গা। আজ এখানেই রাত্রিবাস। এই জায়গাটির নাম লক্ষ্মীবন। সবাই মিলে হাতে হাতে তাঁবুগুলো লাগিয়ে ফেলি। তারপর গিয়ে কাছের এক উঁচু পাথরের ওপর বসে পড়ি। আঃ ! আজকের মত পা-দুটোর বিশ্ৰাম। চারপাশে তাকিয়ে দেখিএযে একেবারে স্বর্গের চার রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি। ডানদিক থেকে সামনে বসুধারা জলপ্রপাতের ধারা অবিশ্রাম ঝরে পড়ছে। নাপড়ছে নাএলোমেলো হাওয়ায় আঁচলের মতো উড়ছে। সোজা তাকালে অরোয়া অঞ্চলঅরোয়া  নালা শতধারায় বিভক্ত হয়ে অলোকানন্দায় মিশে যাচ্ছে। বাঁ দিকে কোনাকুনি উত্তরগঙ্গা উপত্যকা। সেখান থেকে ভাগিরথী হিমবাহ নেমে এসেছে। আর একদম বাঁ দিকে আমাদের আগামীকালের পথের কিছুটা দেখা যাচ্ছে। পথটা কিছুটা এগিয়ে বাঁ দিকের চক্রতীর্থ উপত্যকার দিকে চলে গেছে। ওই বাঁ দিকে থেকে নেমে এসেছে সতপন্থ হিমবাহ। আর ঠিক যেখানে সতপন্থ ও ভাগীরথী হিমবাহ মিলেছেঠিক সেখান থেকেই অলোকানন্দার উৎপত্তি। সূর্যদেব সামনের উঁচু পাহাড়ের আড়ালে গেলেনআর উপত্যকায় সন্ধ্যার ছায়া নেমে এলো। কোথা থেকে সাদা মেঘের দল সামনের পাহাড়গুলোকে মেঘের চাদরে ঢেকে দিতে লাগলো। অন্ধকারের গায়ে আরও এক পোঁচ পড়লো। দূরেউত্তরগঙ্গা হিমবাহ অঞ্চলের শিখরে তখন সোনারঙ লেগেছে। অন্ধকারে মনে হয় পাহাড়গুলো যেন একটু কাছে এগিয়ে এসেছে। হঠাৎ সেই মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। সেই পুণ্যবতী দুঃখিনী মাএকাকিনী এক পাথরের ওপর বসে আছেন। অলকানন্দার পাড়ে বসে আমার এই প্রাচীনঅর্বাচীন ভারতবর্ষের এক পরম্পরাকে বয়ে নিয়ে চলেছেন। কি অসীম সাহসকে বলে নারী দুর্বলমনে মনে সেই মন্দিরের আঙিনার সব ধুলো গায়ে মাথায় মাখি। চোখের জলে চৌকাঠের ওপর মাথা রাখি

রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবিকাল বেশি পথ নয়। তারপরেই দেখতে পাবো অলকানন্দার জন্মস্থান। সে পুণ্যস্থানও বটে। হঠাৎ পাহাড়ে গুমগুম গুমগুম শব্দ ওঠে। কাছ থেকে দূরে সে শব্দ প্রতিধ্বনি হতে থাকে। আমি উঠে বসি। সংগ্রামজি.....হাঁ দিদিসাড়া দেয় সংগ্রামআমি বলিইয়ে ক্যা আওয়াজ আ রহা হ্যায়কুছ নেহিদিদিআভালাঞ্চ হ্যায়সো যাইয়ে। সে স্বর্গভূমিতে অভ্যালাঞ্চের গুমগুম শব্দ কেমন দুন্দুভির মতো শোনায়। তারপর থেকে থেকেই সেই দুন্দুভি বাজতে থাকে। তাঁবুর চেনটা খুলে বাইরে উঁকি দিই। আকাশে চাঁদ নেই। মাথার ওপর নক্ষত্রের নকশা কাটা আকাশ। আবছা আলোয় পাহাড়ে হেলান দিয়ে কুয়াশারা গল্প করে ।আমি কান খাড়া করিওরা চুপ করে থাকে। আবার কতক্ষন পর যেন ফিসফাসবিষণ্নতায় ভরা। সেই অলীক নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে কার এক গুমরোনো কান্নার শব্দ। সেই ফিসফাসে একটু যেন উত্তেজনাএই অলকার কথাই ধরোজন্মের পর থেকেই বন্দিনী সে মানুষের হাতে। সারা পাহাড় জুড়ে লোভের ফাঁদ পেতেছে তারা। পাহাড়ী নদীদের বন্দি করছেতাদের কোমল শরীর নিংড়ে বিদ্যুৎ তৈরি করছেনিজেদের লোভের পূজায় নদীদের আহুতি দিচ্ছে। কি যন্ত্রনায় যে  নিষ্পাপ নদীগুলো কষ্ট পাচ্ছে। এ জীবনে ওদের আর মুক্তি মিলবে না। এই কান্নাটুকুই ওদের একমাত্র সান্ত্বনা। আবার সব চুপচাপ। .....কিন্তু একদিনএকদিন সব অত্যাচারীদের মতোই এদেরও চরম শাস্তি হবেসেই আশাতেই তো অলকা এখনও বেঁচে আছে। ওর দুচোখে যে এখনও সমুদ্রের স্বপ্ন। কী শুনছি এসবহায় ভগবানএরা কারাকিছু ক্ষুদ্র লাভের আশায় মানুষসমগ্র মানব জাতির জন্য কি ভয়ানক অভিশাপ কুড়িয়ে আনছে?

দিদি, উঠোউঠে বসি। ভোর বেলা কখন যে চোখ লেগে গেলইয় লো চায়। চা খেয়ে হাঁটা শুরু করি। কালকের কথা গুলো মাথার মধ্যে ঘুরে ফিরে আসছে পথ তো বেশি নয়পথের নেশাটাই বেশি। অবশেষে পৌঁছে গেছি। অনেক নীচে দুই হিমবাহের সংযোগস্থলের সিংহদুয়ার খুলে হিমালয়পুত্রী অলকানন্দার শিশু ধারা তিরতির করে বেরিয়ে আসছে। হিমবাহ-মায়ের কোলে বসে সমুদ্রের পথের ঠিকানা জেনে নিচ্ছে সে। মায়ের আশীষ মাথায় নিয়ে ঐতো সে এগিয়ে চলেছে। সে জানে নাপথের ফাঁদের কথা। একটু পরেই সে সারা জীবনের জন্য বন্দি হয়ে যাবেএটাই তার ভবিতব্য। মানুষ তার কৃত  পাপের কর্মফল স্বরূপ পৃথিবী থেকে একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেনিশ্চিতরূপে। এটাও ভবিতব্যআমি দেখতে পাচ্ছিহিমবাহ-মা তাকিয়ে দেখছেন তাঁর সন্তানের চলে যাওয়াসে আর কোনোদিন ফিরবে না তাঁর কোলে। উজানে যে আর ফেরা যায় না















বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০

এক মিলনগাথা !!

খেরকুটিয়া নদীর নীল জলে হাঁস চরে। দূরঘাট দিয়ে নৌকো যায়। নদীর অলস স্রোতে কচুরিপানার ভেসে আসা, ভেসে যাওয়া; আমি ভাবি, এই আমার দেশ, আবার দেশ নয়। আমাদের হুরে দিশাহীন জীবনে এই দৃশ্য যেন কোনো পুরোনো বইয়ের ছেঁড়া পাতা।

হেমন্তের মাঠে ধান কাটার মনোরম দৃশ্য। পড়ন্ত  রোদে মহিলারা ধান কাটায়  ব্যস্ত। পুরুষরা সেই ধান-কাঁধে বাড়ির পথে। এই ধান থেকে চালে পৌঁছনোর রাস্তা বড় সোজা নয়। প্রথমে ছড়া থেকে ধান আলাদা করা, তারপর অনেক পথ পাড়ি দিয়ে তবে সে চাল হয়। সে যাই হোক, আসল কথা হলো, এই যে ধান  কাটা আর মাঠ থেকে বাড়ির উঠোন, এই চলনের ছন্দটা আমাকে একটা যেন আনন্দের আবেশ দিয়ে ঘিরছে। আমার আজ বিকেলের এই অলস অবসর আমাকে যেন পূর্বজন্মের স্মৃতি মনে করাচ্ছে।

লুইট নদী লোহিতের আদরের নাম; কেমন শান্তটি  হয়ে শুয়ে আছে। ছোট ডিঙি নিয়ে দিনের শেষে নদী হাতড়ে বেড়ায় গাঁয়ের মানুষ। দূরে  জাল পাতা। এক মেছোবক জলের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। নদীর চড়ায় দুটো শামুক ভাঙা পাখি। দাঁড়িয়ে আছি বাঁশের সাঁকোয়, একটু ঝুঁকে মাঝিকে সুধোই, কি পাইলা, মাঝি? আমার ওই টুকু নড়াতেই সাঁকোয় খচরচর, নিজেকে সামলাই কোনোমতেমাঝি হাসে, বলে, ভিনদেশি  দেখি, বাসা কইহানে? কলকাতা, অয়,পাইসি কয়খান বরিয়ালা। উত্তরবাংলায় বরোলি শুনেছি, বরিয়ালা শুনিনি। জিজ্ঞাসা করব, তার আগেই ডিঙি এগিয়ে গেছে নদী বেয়ে। 

আজ যাবো, মাজুলি। একা মানুষ, পথে এপা ওপাশ তাকাই। নিমাতি, নিমাতি, নিমাতি  শুনে এগিয়ে যাই গাড়ির দিকে। যাইবেন নাকি? হ্যাঁ, কমলাবাড়ি ঘাট। অ, কমলাবাড়ি, কৈ যাইবেন, মাজুলি? হ্যাঁ, কেউ থাহে? নাএকা আইসেন? হ্যাঁবয়েন, বয়েন। ভিতরে ঢুকে বসি। গাড়ি চলে। বাজার ছাড়িয়ে পাড়া ছাড়িয়ে গাড়ি ধান ক্ষেতের মাঝ বরাবর পাকা রাস্তা দিয়ে ছুটে চলে। মাঠভরা পাকা ধান, হেমন্তের সোনালী রোদ সব মিলিয়ে যেন কেমন যেন নেশা লাগে। পৌঁছলাম কমলাবাড়ি নিমাতি ঘাটে। সামনে ব্রহ্মপুত্র, বিশাল ডানা মেলে শুয়ে আছে। দূরে তাকাই, যতদূর চোখ যায়, ধু ধু বালির চর। শুশুক লাফায়। টিং টিং টিং টিং, ওরে বাবা নৌকো ছাড়বে, তাড়াতাড়ি টিকিট কেটে নৌকোয় উঠি। গাড়ি, লরি সব নিয়ে সেই নৌকো চলেছে মাজুলি।

নৌকো ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে। নদীর বুকে পলি পড়ে চড়া। সূর্যের আলোয় চড়ার বালী চিক চিক করে। হঠাৎ কেন জানি বাবার কথা মনে পড়ে। দেশভাগের আগেই কর্মসূত্রে এপারে চলে আসা। কলকাতা শহর। আদি বাড়ি ছিল বরিশালে। সেখানে চেনা সুখ চেনা দুঃখের আটপৌরে জীবন। বাংলা দেশের কথা তারা কোনোদিনই ভুলতে পারেন নি। ছোট বেলা থেকেই আমরা সেই বরিশাল, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র শুনেই বড়ো হয়েছি। বাবা আজ আর নেই, কিন্তু আজও ওই বাড়ি সেই পূর্ব বাংলার গল্প বলে। আমরা কোনো দিনই বাংলা দেশে যাই নি, শুধু শুনে শুনেই এক ঘুঘু ডাকা ছায়ায় ঢাকা ছোট্ট গ্রামের ছবি মনে আঁকা হয়ে গিয়েছিল। আর ছিল এক নদী, তার নাম কীর্তনখোলা। এমন সুরেলা নামের নদীর নাম আর কখনও শুনিনি। সেই নামখানি মনের ভিতরে যেন একখানি নকশিকাঁথা হয়ে বিছিয়ে আছে। বাবার কাছে শোনা, শীতের দুপুরে কীর্তনখোলার জল জোয়ারের টানে প্রায় উঠোনে উঠে আসত। সেই সুপুরি নারকেল গাছে ঘেরে গ্রাম্য জীবন নদী আকাশ মানুষের সাথে এক অদ্ভুত বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। জেগে আছ, নাকি ঘুমোলে? কে ডাকে? চারপাশে তাকাই, না,কেউ তো নেই। ভাবনার সুর কেটে যায়। নদীর কোলে উঁকি দিই, চিনতে পারো আমায়? নদীর হাওয়ায় ব্রহ্মপুত্রের ইশারা। ডাকলে আমায়? কত কাল পরে দেখা। আমি আশ্চর্য হই, কি করে চিনলে আমায়? নদীতে কুলুকুলু, বলে, চিনি নি, শুনেছি। কীর্তন আমায় ডাক দিল যে। অবাক হয়ে বলি,তু মি ওকে চেনো? .........সে যেন শুনতেই পেলো না, কীর্তন তোমার শরীরের শিরা উপশিরায় বয়ে চলেছে, মনে, চেতনা অবচেতনে সে তোমার সাথে জড়িয়ে আছে, বলে চলে সে। আমার চোখ জলে ভরে ওঠে, অজান্তেই। কিন্তু, তাকে তো আমি কোনো দিন দেখিই নি,এইতো, এইতো আমিবলতে বলতে চোখ দিয়ে সে অঝোর ধারায় বেরিয়ে আসে, আমার ভিতরে মোচড়ের পর মোচড়, বুকের ভিতরের নকশিকাঁথাটান পড়ে কীর্তনকে বুকে পেয়ে হেমন্তের ব্রহ্মপুত্র খুশিতে কলকলিয়ে ওঠে, এইবার আমরা বেশ সবাই সবাই হলাম। নৌকো আপন মনে উজিয়ে চলে ব্রহ্মপুত্র বেয়ে...........মাজুলির দিকে। 

কবিতা ৮ ।

 সপ্তসিন্ধু পার করে লখিন্দর ফেরে ঘরে।সাথে করে  বিবিধ রতন। শঙ্খ বাজে, উলু দেয় এয়োতি, পুরজন। বাপ তার, চন্দ্র সওদাগর। লখার সাফল্যে মুখে তার  গো...