রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পুনর্জন্ম

“হার না মেনে লড়ছেন রিয়া, তাই চরিত্র হনন ?” চোখ আটকে যায় সম্পাদকীয়তে। এই সময় সংবাদপত্রে ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০২০-এর প্রতিবেদন। হঠাৎই মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। আজকের মেয়েরা সমাজের অসুখটা চিহ্নিত করে ফেলেছে। সমাজে নির্লজ্জ রূপটা সারা পৃথিবীর সামনে প্রকাশ করে দিয়েছে। অপরাধ প্রমাণ হলে শাস্তি পেতে হবেই, সবাই জানে। কিন্তু, চরিত্র নিয়ে একি নোংরামি! ভারতীয় সমাজ কোনদিনই স্বাধীনচেতা, আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভর মেয়েদের পছন্দ করে না। সমাজের নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই এই রোগে আক্রান্ত। ভারতীয় পুরাণ ও মহাকাব্যে এর প্রমাণ আছে অনেক। চরিত্র কাকে বলে?

স্মৃতিপথ বেয়ে মন পিছন দিকে হাঁটে। একটা মুখ, আবছা একটা মুখ, অসহায় একটা মুখ স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে। ছোট একটি ছেলের হাত ধরে বাবার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে। “কি ব্যাপার, তুমি?” মা দাঁড়িয়ে দরজায়। “জামাই কই?” “আমি আর ওখানে যাব না, মা”, বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়েটি। “আচ্ছা, আচ্ছা, বোসো তো এখন, বাকি কথা পরে হবে”।

হাত মুখ ধুয়ে ঘরে বসে সে। কিছু ভাল লাগছে না। “এস দাদুভাই, কখন এলে?” বাবা বাজার থেকে ফিরেছেন। ব্যাগদুটো হাতে নিয়েই মা গজগজ করে, আবার চলে এসেছে তোমার মেয়ে। কত করে বোঝালাম, শ্বশুরবাড়িতে ওরকম একটু আধটু হয়, সেগুলো মানিয়ে নিতে হয়। “আঃ, একটু থামো তো, কই রে খুকি—কান্নাটা আর আটকাতে পারলো না সে। “বাবা” বলে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে। “শান্ত হ দেখি, শুনি কি হয়েছে?” নতুন কিছু শোনানোর নেই, গতানুগতিক একই ঘটনা। আজ তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সব শুনে বাবা বলেন, থাক আমার কাছে কটা দিন। সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মেয়েটি জানে আর কিছুই ঠিক হবার নয়। স্বামী দুশ্চরিত্র, মদ্যপ। মাইনের টাকা তার নিজে শখ আহ্লাদেই শেষ কয়ে যায়। শ্বশুর শ্বাশুড়ী কথায় কথায় শোনান। শারীরিক অত্যাচার এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার। গায়ে হাত তোলা শুরু হয়েছিল তার গয়না নেওয়ার প্রতিবাদ করায়। সেদিন শখ মেটানোর টাকা তার কাছে ছিল না, তাই গয়না চাই। সেই নিয়ে কথা কাটাকাটি। তারপর জোরজার, তারপর শারীরিক বলপ্রয়োগ। আর পারেনি সে আটকাতে। সারা রাত একা ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কেঁদেছিল। সকালে শাশুড়িকে সব খুলে বলে সে। তিনি সব শুনে হেসে বলেন, “তা বাপু, প্রথমেই যদি দিয়ে দিতে, তাহলে তো আর মার খেতে হতো না”। যত বার বাপেরবাড়ি এসে বাবা মাকে বলে সে, তারা বলেন “একটু সহ্য করো, সব ঠিক হয়ে যাবে”। এমনই কাটে তার দিন। কিন্তু কাল তাকে পরিষ্কার বলে দেওয়া হয়েছে, তাদের ছেলে সংসারে টাকা দেয় না। তাই তার ভরণ পোষণ তারা করতে পারবেন না। বাবা সব শুনে চুপ করে বসে থাকেন। “তাহলে আর কি, সারাজীবন থাকো এখানে পড়ে। তা, তাদের ছেলেটাকে সঙ্গে করে নিয়ে এলে কেন? তাদের ছেলে তাদের কাছে দিয়ে এলেই পারতে”, মা বলতে থাকেন। পায়ের নীচের মাটিটা কেঁপে উঠেছিল কি তখন? কদিনে মনটাকে শক্ত করে নেয় সে।

চাকরি একটা তাকে পেতেই হবে। খবরের কাগজ দেখে পাগলের মতো চাকরির খোঁজ করতে থাকে। বেসরকারি চাকরি একটা পায় সে। সকাল দশটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা। সকালে বেরোয়। সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফেরে। ছেলের চার বছর বয়স হলো। তার স্কুলে ভর্তির ফর্ম তুলে আনে। রাতে খেতে বসে মা জিজ্ঞাসা করে, “তাহলে কি ঠিক করলে? এখানেই থেকে যাবে? আমাদের মানসম্মানের কথাটা মাথায় এল না”। সে মায়ের দিকে তাকায়। মা খুবই বিরক্ত। বাবাকে বলেন, “এই মেয়ে আমাদের পরিবারের নাম ডোবাল। বিয়ের পর মেয়েরা সংসার করে না একথা কোনদিন শুনিনি বাপু। বাবা কথার উত্তর দেন না। সে ছেলেকে নিয়ে খাওয়া ছেড়ে উঠে যায়। “যত্ত সব আমার কপালে, পাড়ার সব লোক জিজ্ঞাসা করে”, পিছনের থেকে মা বলে ওঠে।

সন্ধ্যেবেলা স্টেশন থেকে একা বাড়ি ফেরা। একদিন একটি ছেলে কটুক্তি করে। ও তাড়াতাড়ি পা চালায়। বাড়ি ফিরে এসে বলে। বাবা বলেন, “কাল থেকে আমি আনতে যাব”। “কি জানি কি কেলেঙ্কারি ঘটবে এবার”, মা বলে ওঠেন। বাবা রেগে বলেন, “আবার শুরু করলে তুমি”।ছোট ছেলেটা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

বাড়ি ফিরে দেখে দরজার বাইরে অনেক চটিজুতো রাখা। পরদা সরিয়ে দেখে তার স্বামী, তার বোন আর বোনের বর। “এতদিন কি রাগ করে থাকতে হয়? কোথায় গিয়েছিলে? তুমি সত্যিই চাকরি করছো না কি? মাসীমা বলছিলেন”। কোন উত্তর না দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। মা এলেন বড় এক ট্রে হাতে, মিষ্টির থালা। “দেখ না, এত করে বোঝাচ্ছি, কিছুতেই শুনছে না। স্বামীর সাথে রাগারাগি কার সংসারে হয় না বল তো, তাই বলে শ্বশুরঘর করবে না?” ঘেন্নায় কথা বন্ধ হয়ে গেছে তার। এ কি তার নিজে মা? ননদ বলে, না না, চাকরি-বাকরি করতে হবে না। আমাদের বাড়িতে ওসবের চল নেই। নাও তো, জিনিসপত্র গুছোও, নাতির জন্য মায়ের খুব মন খারাপ”। “না, আমি যাব না। চাকরিও ছাড়ব না”। “তা যাবে কেন, ওনার স্বাধীনতা চাই”, মা বলে ওঠে, “তা, তোমরা এক কাজ কর, তোমরা তোমাদের বংশের নাতিটিকে নিয়ে যাও। শেষ বয়সে দাদু ঠাকুমা নাতিকে দেখতে পাবে না, তা কি হয়! ও থাক ওর চাকরী নিয়ে”। “না”, ও ছুটে ওর ঘরে ছেলেকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। শত ধাক্কাধাক্কিতেও খোলে না। সারা রাত ছেলেকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে থাকে।

দিন কেটেই যাচ্ছিল। একদিন শমন আসে তার নামে। খুলে দেখে, বিচ্ছেদের মামলা হয়েছে। বাবাকে বলে। মা বলতে থাকে, “আমাদের বংশে এরকম আগে কখনো ঘটে নি। এখনও মিটিয়ে নাও সব গণ্ডগোল, ফিরে যাও শ্বশুরবাড়ি”। সে মাথা নিচু করে কাগজটা পড়তে থাকে। তাতে লেখা, দুশ্চরিত্রা স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করা সম্ভব নয়, তাই এই মামলা করে বিচ্ছেদ চাওয়া হয়েছে। এ কী দেখছে সে! এত অত্যাচার সহ্য করা কোনো মেয়ের পক্ষে সম্ভব? সেই আবছা মুখখানা যেন একটু একটু করে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেই দিশাহারা জীবনকে পিছনে ফেলে সে এক দিশা খোঁজে। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে তার। চোখ থেকে অগ্নিস্রোতের লাভা গড়িয়ে নামে দু-গাল বেয়ে। ছেলের হাতটা শক্ত করে ধরে চটিতে পা গলায়। সে এই লড়াই লড়বে। মনকে শক্ত করে সে। মনের মেরুদণ্ড হলো চরিত্র। কবির কথা মনে পড়ে তার; ভীষণ দুর্দিনে মানুষের বুদ্ধির নয়, চরিত্রের পরীক্ষা হয়। আজ সে শুভদিন। সেই পরীক্ষা দেবে সে। কতগুলো নিচুমনের মানুষের বিকৃত চিন্তার খোরাক হয়ে থাকবে না। এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জীবনের খাতার পাতায় তার জীবনদেবতার সাক্ষর নিয়ে বেঁচে থাকবে সে। নাম যে তার আগ্নেয়া।  


মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

করোনার সাক্ষাতে


 

চার দিকে শুধু হাত ধোও, পা ধোও, কাউকে ছুঁয়ে ফেলার বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাও। কি ভাবে ধুতে হবে তাও টেলিভিশনে শেখানো হচ্ছে। এই মাত্র শুনলাম, একুশ দিন বাধ্যতামূলক ঘর বন্ধ হয়ে থাকতে হবে। অচেনা অসুখ, স্পর্শ থেকে, নিশ্বাস থেকে সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে বাড়ি থেকে বেরোনো নিষেধ। ছাদের বাগানে বসে আছি সকাল থেকে, নিশ্চিন্তে, সংক্রমণের ভয় নেই।

ওটা কি? আমার দিকেই তো তাকিয়ে আছে, ক্যামেরাটা হাতের কাছেই ছিল। যেই ওর দিকে তাকে করেছি, ওমা ঠিক বুঝতে পেরেছে ওর ছবি তুলব, অমনি বেরিয়ে এসে আমার কোলের উপর বসে আর কি! কাছাকাছি হতে ভালো করে দেখতে পেলাম। ছোট বলের মতো, গায়ে কাঁটা কাঁটা আছে, খুব চেনা লাগছে, অথচ চিনতে পারছি না। মুখটা হাসিতে ভরা।... কি হলো ছবি তোল, ছবি তুলতে গিয়ে চিনতে পারলাম, আরে, এত করোনা। আমি ভ্যা করি আর কি। ও তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, না, না কেঁদো না, কেঁদো না, কাঁদলেই সর্দি হবে, আর সর্দি হলেই.......ভয়ের চোটে কাঁদতে ভুলে গেলাম। ক্যামেরা রেখে তাড়াতাড়ি সানিটাইজারের শিশিটা খুলি। হাতে ঢেলে ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে ভালো করে ঘষতে লাগলাম। আমায় হাত ঘষতে দেখে ও একটু সরে দাঁড়ালো। ভয় দেখাচ্ছ আমায়, আমি তো তোমাদের ভালোই চাই। আমি বলি, তাই নাকি? তোমার ভয়ে পৃথিবীর কি অবস্থা হয়েছে দেখো। ও জিজ্ঞাসা করে, কি হয়েছে? লজ্জা করে না, না কি চোখের মাথা খেয়েছো, সারা পৃথিবীতে কত লোক মারা গেল আরও কত যে যাবে, জানি না।

ও একটু কাছে এগিয়ে এলো, বললো, তোমরা মৃত্যুকে খুব ভয় পাও, তাই না? আমি বলি, হ্যাঁ, পাই তো, কে না পায় শুনি, তুমি পাও না? ফিক করে হাসে, বলে, না, পাই না। আমরা অমর। পৃথিবীতে কোনো শক্তি নেই যে আমাদের নাশ করে। আমায় একটু জল দেবে? বলে আমার বোতলের দিকে এগিয়ে যায়। আহা করো কি, করো কি, আমি চেঁচিয়ে উঠি, ও থতমত খায়, তাকিয়ে দেখি, খুব শুকনো দেখাচ্ছে ওকে। একটু বসি, খুব ক্লান্ত লাগছে। বসো, তবে একটু দূরে, আমি বলি। মুখটা তার খুশিতে ভরে উঠলো। ওই যে, শেষের আগের টবটায়, যেটায় পিটুনিয়ার শেষ ফুলটা ফুটেছে ঠিক সেটার ওপরে গিয়ে বসলো। শিশিরের ফোঁটাটা বুঝি তখনও শুকায় নি, সেটুকু পান করে সে একটু চুপ করে বসে রইলো।

আমি সকালে ফুল তোলার পর কিছুটা সময় ছাদেই কাটাই। এ সময় এ কী আপদ! আরেকবার সানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে নিলাম। সামনেই করোনা বসে আছে। উফ, শান্তি নেই।

কি যেন বলছিলে, সে কথার খেই ধরে আমার দিকে ফেরে।.....বলছিলাম, কেন এই পৃথিবীকে এত ভয় দেখাচ্ছ, এখানে এমনিতেই এত সমস্যা, আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সে বলে, এই তো, নিজেদের গুনের কথা বলে ফেললে, বলি, তোমরা যে ধর্মের নামে, জাতের নামে, দেশপ্রেমের নাম করে পৃথিবী জুড়ে মানুষ মারছ, তার বেলা? আমার নাম করে ঢাক বাজিয়ে বেড়াচ্ছ আমি নাকি তোমাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী? নিজেরা যখন খুন করছো তখন তো ঢাক বাজিয়ে বলছো না? এ বলে কি? এত খবর এ পেল কোথা থেকে? আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে গলা উঁচু করে বলে, সব কথা বলবো নাকি? আমি বলি, থাক, থাক, সকালবেলায় এসব কথা ভালো লাগে না, কোথায় একটু ঠাকুরের গান শুনবো, তা নয়, "বেশ, বেশ, তাহলে ঠাকুরের কথাই বলি, এই যে তোমরা সব জন্মেছ মরনশীলতা নিয়ে। তোমাদের বানিয়েছে যে সেই ব্রহ্মা ঠাকুর, নশ্বর আর মরণশীল করে। তোমাদের বানিয়ে ইস্তক কি যে আফসোস তার, ভাগ্যিস তোমরা মরণশীল, না হলে না জানি তার ভাগ্যে আর কি ছিল? আচ্ছা, তোমায় একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, “তোমরা মানুষেরা মরতে ভয় পাও কেন? কেন মানতে চাও না যে জন্মালে মরতেই হবে। এই পৃথিবীতে  সকল প্রাণী, সবাই সময় ফুরোলেই পৃথিবী ছেড়ে যায়, আর এই  বেশিদিন বেঁচে থেকে পৃথিবীটার কি উপকারটা করছো শুনি? এই সুন্দর পৃথিবীটার কি দুরবস্থাটাই না করেছ। জল, হওয়া সব বিষিয়ে দিয়েছ। আর যে কথা বলছিলাম, তোমাদের উৎপাতে ব্রহ্মা ঠাকুরের সকল সৃষ্টির মধ্যে আর সমানুপাত থাকছে না।" আমি বলি, সে আবার কি? “বুঝতে পারছো না, কত জন্ম পার করে, কত কত জন্ম মৃত্যুর ভিতর দিয়ে একটা আত্মার উৎকর্ষ ঘটে, তবে সে মানব শরীরে স্থান পায়। আবার মানব জীবনের অন্তে নিজের নিজের কর্মফল অনুসারে তাকে বিভিন্ন প্রাণীরূপে জন্মগ্রহণ করতে হয়। এবার তোমরা কি করেছো দেখো। সব প্রাণী মরছে তোমরা ছাড়া, তোমাদের ঘরে খালি জন্মাচ্ছে। বাকি প্রাণীদের কথা একবার ভাবো, সবার প্রায় বংশ বিলোপ হওয়ার অবস্থা। সকল প্রাণীর আত্মা উন্নীত হতে হতে অবশেষে মানব শরীর পায়, কিন্তু মানবজাতি মরতে না চাইলে সৃষ্টিকর্তার কাজ ব্যাহত হয়।...এই দেখ, এই সব আষাঢ়ে গল্প তুমি কোথায় পেলে? সে বলতে থাকে, আষাঢ়ে নয়, এই কথা তিনি নিজের মুখে বলেছেন আর আমরা নিজের কানে শুনেছি। আমি বলি, বটে, বটে, তা এসব কথা তিনি কাকে বললেন? “আমাদের শিবঠাকুরকে গো, আমরা সব তাঁর বাড়িতেই থাকি কিনা, সারা বছর ওনার কাজ করি। শুধু এই বসন্তকালে যখন পৃথিবী শীতের চাদর সরিয়ে অপরূপ রূপ ধারণ করে তখন আমাদেরও আর ঘরে মন টেকে না। এই এক মাস আমাদের ছুটি মঞ্জুর হয়। আমরা তখন এখানে ছুটি কাটাতে আসি”।“আমরা, আমরা যে করছো”  আমার মুখের কথা টেনে নিয়ে সে বলতে থাকে, আমরা মানে আমরা, আমাদের যে তিনি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছেন, তাইতো আমরা অমর। আমি হেসে ফেলি, বলি, “তা তোমরা যে বেড়াতে বেরোলে, তাতে তাঁর যে খুব অসুবিধা হবে, কাজকর্মগুলো করবে কে?" আছে, আছে, তাঁর কি কাজের লোকের অভাব? বন্যা, খরা, মড়ক, কালবৈশাখী সবাই আছে। তিনি তাঁর কাজের জন্য আমাদের সবাইকে নিজের হাতে সৃষ্টি করেছেন। সবাই বছরের কোনো না কোনো সময় ছুটি পায়, এবার বুঝেছো? বুঝলাম.......আবার একবার হাতটা পরিষ্কার করে নিই, কে জানে কোথা থেকে কি হয়? তা এখন তোমার মতলব কি শুনি? সে বলে, মতলব আবার কি একটু বেড়াতে এসেছি আর তোমরা আমায় কি বদনামটাই না দিলে, অতিথির সাথে বুঝি এমন ব্যবহার করতে হয়? বলতে বলতে ওর গলা ধরে এলো, খানিক চুপ করে থেকে আবার বলতে লাগলো, আমায় একজন বলেছিল, পৃথিবীতে কেউ ঈশ্বরকে মানে না।  আমি প্রতিবাদ করি, বললেই হলো, আমাদের রোজ পূজা, উপবাস, আরতি, নকুলদানা..... তুমি বুঝি কোনো মন্দিরে যাও নি? "না" সে বলে, “কিন্তু শুনেছি, মন্দিরে একটা পাথরকে ওরা দেবতা বলে। সেই দেবতার অনেক টাকা, সবাই পূজা করে, আশীর্বাদ হিসেবে তারা খালি টাকা চায়। সবাই দেবতার কাছে যেতে পারে না, শুধু যাদের অনেক টাকা তারাই যেতে পারে। মন্দিরের দেবতারা খালি বড়োলোকদের ভালোবাসে, শুধু তাদের কথা শোনে। দুঃখী মানুষের কথা দেবতারা শোনেও না, ভাবেও না। আচ্ছা, মন্দিরের পাথরের মূর্তিগুলো (যাদের তোমরা দেবতা বলো), তারা টাকা নিয়ে কি করে?" বড় শক্ত প্রশ্ন। উঃ, আমি ভয়ে মরছি তায় আবার এত প্রশ্ন।

আমি কথার প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাই, প্রশ্ন করি, কি কি দেখলে?  তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বললো, অনেক কিছু। জলের নীচে কতো মাছ। বড় একটা মাছ আমাকে ফোয়ারার জল ছিটিয়ে স্নান করিয়ে দিল। একটা মাছ আমায় খেতেও এসেছিল। তারপর একটা কচ্ছপের পিঠে চড়ে ডাঙায় উঠলাম। চারপাশে তাকিয়ে দেখি বড় বড় সব গাছ। নাম-না-জানা সব ফুল। আমায় বসতে দিলো, খেতে দিলো। বিশ্রাম নিলাম। তারপর সেই জঙ্গল  থেকে বেরোবার পথ ধরলাম। সেই পথ এক গ্রামে গিয়ে শেষ হলো। কি সুন্দর সেই গ্রাম, পিছনে তার এক বরফের পাহাড়। প্রথম কদিন ঠিকই ছিল। তারপর একদিন ফিসফাস কানে এল। এক নাকি করোনা বলে কেউ এসেছে। সে যাকে ছুঁয়ে দিচ্ছে সেই নাকি মরে যাচ্ছে। তার গায়ে নাকি কাঁটা আছে। নদীতে স্নান করতে গিয়ে নিজের ছবি দেখে আমি চমকে উঠি। আমার গায়ে কাঁটা। এরা আমার কথা বলছে না তো? কদিন যেতেই বুঝতে পারলাম, আমাকেই ওরা করোনা বলে ডাকছে। খুব মন খারাপ হয়ে গেল আমার। একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছি, এ রাস্তা, ও রাস্তায়, সেখানে দেখি আরেক কান্ড। পথচারী দেখলেই লাঠি হাতে কিছু লোক তাদের তাড়া করছে, তাদের মারছে। আমার খুব কষ্ট হলো। আচ্ছা, মানুষ হয়ে মানুষকে মারতে তোমাদের কষ্ট হয় না? তারপর শুনলাম, সবাই ঘরে বসে আছে, কেউ বাইরে বেরোচ্ছে না, পাছে আমার ছোঁয়ায় অসুখ করে। আমি এত দুঃখেও হাসতে লাগলাম। জাতিভেদ, দারিদ্র্য, এত বড় বড় অসুখ থাকতে আমাকে তোমাদের এত ভয়? আমার থেকে পালাতে পারো কিন্তু ওই অসুখগুলো থেকে পালাবে কোথায়? আবার শুনি, বসন্তের হাত থেকে বাঁচার জন্য তোমরা একটা দেবতা বানিয়েছ। আমি দেখছি আর ভাবছি যে এই দেবতাগুলোকে তোমরা কোথা থেকে  পেলে? এদের তো ঈশ্বর সৃষ্টি করেন নি। জানো, সব শুনতে শুনতে আমার দেবতা দেখার ইচ্ছে হয়েছিল। মন্দিরের মধ্যে  ঢুকেছিলাম। দেখলাম, প্রায় তোমাদেরই মতো দেখতে, শুধু নড়া চড়া করতে পারে না। ওই মূর্তিগুলোকে তোমরা ভয় পাও। সর্বব্যাপী ঈশ্বর আর তোমাদের মাঝে ওই মূর্তিগুলো বিচিত্র ভয় আর মায়া দিয়ে এক দূরত্ব তৈরি করেছে। ওই দেবতাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তোমরা ঈশ্বরের হাত থেকে মুক্তি পাবে? ঈশ্বর ভাবছেন, এই অপূর্ব সৃষ্টিকে কি ভাবে রক্ষা করবেন, আর তোমাদের দেবতারা ভাবছেন, তোমাদের বোকা বানিয়ে কিভাবে ঈশ্বরের স্থানটা দখল করবেন।

ওকি, তুমি আমার দিকে এগিয়ে আসছ কেন, ওখানেই তো বেশ বসে ছিলে, বলতে বলতে আমি তাড়াতাড়ি হাতে সানিটাইজারটা ঢালি, ও বলে চলে, এক দেবতা নামের জড় পদার্থকে ভরসা করে সৃষ্টিকে ধ্বংসের খেলায় মেতেছ তোমরা, তোমাদের সৃষ্ট দেবতারাও তোমাদের সাথেই বিনষ্ট হবে একদিন, নিশ্চিত রূপে। .....এই একদম কাছে আসবে না, “আমি আর বাঁচতে চাই না, আমাকে দিয়েই শুরু হোক" বলতে বলতে সে আমার হাতের উপর এসে বসলো। আমার হাতের ঘষায়, সানিটাইজারের এলকোহলে করোনার ছোট্ট সুন্দর শরীরটা থেঁতলে গলে গেল। আমার দুচোখ ঝাপসা হয়ে গেল। কত সহজ ভাবে ও শিখিয়ে দিয়ে গেল, কোনো মহত উদ্দেশ্যে প্রাণ রক্ষার থেকে প্রাণদানের প্রয়োজন অনেক বেশি।

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২০

সম্পর্কের অন্তরালে

"ম্যাডাম, আমরা তাহলে আজ উঠি, যদি আরও কিছু মনে পড়ে তাহলে ফোন করবেন। এত ভেঙে পড়বেন না।" রমা মাথা নাড়ে। পুলিশ অফিসার চলে গেলে দরজাটা বন্ধ করে আবার চেয়ারে বসে পড়ে। কি যে দুশ্চিন্তা, কিন্তু ভেবে কোনো কুল কিনারা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে একটা কথা জলের মতো পরিষ্কার করে জানা গেছে; তার জীবনের এই বিপর্যয়ের মূলে তার মা, হ্যাঁ, নিজের মা। গ্রেপ্তারের কথা পুলিশ বারবার বললেও সে সায় দিতে পারেনি, তার মূল্যবোধ তাকে পিছনে টেনে রেখেছে। ভাবছে আর ভাবছে, কি করবে সে এখন? এ লজ্জার কথা কাকে বলবে, কে বিশ্বাস করবে? আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সবার মধ্যেই একটা ফিসফাস, তাকানোর মধ্যেও একটা অস্বাভাবিক ভাব। অনেকক্ষণ পর চোখ মুছে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। গেটটা দেখা যাচ্ছে। রোজ সকালে বাবু স্কুলে যাওয়ার সময় ওখান থেকেই বলতো, "মা, আসি", বারান্দা থেকে সে হাত নাড়ত, বলতো, "সাবধানে যেয়ো"। নিয়মমাফিক এই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হতো রোজ। তবে, ওইদিন কি হয়েছিল? বাবু স্কুলে বেরিয়ে যাওয়ার পর রমা ছোট ছেলেকে ক্রেশে দিয়ে রোজকার মতোই অফিসে গিয়েছিল। ফেরার পথে রোজকার মতোই ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল। বাড়ি ফিরে হাত পা ধুয়ে চা বসায়। মায়ের হাতে চায়ের কাপটা দিয়ে বাবুর কথা জিজ্ঞাসা করে। মায়ের কাছে জানতে পারে যে বাড়ির পাশের মাঠের মেলায় গেছে। কথায় কথায় আরও কিছু সময় কেটে যায়। আমি আসছি, রমা বলে। মা জিজ্ঞাসা করে, কোথায় যাচ্ছ? সে বলে, দেখি বাবুকে একবার। মা বলে ওঠে, তোমায় একটা কথা বলার ছিল, বাবু বাড়ি থেকে চলে গেছে। কি, কি বললে? রমা চিৎকার করে ওঠে। তুমি তো এতক্ষন বললে না রমাকে থামিয়ে দিয়ে তিনি বলতে থাকেন, তোমাদের জন্য একটা চিঠি লিখে রেখে গেছে। ভেবেছিলাম তোমাদের খাওয়া হয়ে গেলে বলবো। কি নির্বিকার ভাবে বলে যাচ্ছেন তিনি, রমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। সে আর সহ্য করতে পারে না, চিৎকার করে বলে, “তুমি মিথ্যা কথা বলছো।" সেই চিৎকারে বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। সব শুনে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলেন, “সেই সর্বনাশটা করলে!" বলতে বলতে তিনি হু হু করে কেঁদে ফেলেন। আশি বছর বয়স তাঁর, এই বৃদ্ধ বয়সে এই শোক তিনি কি ভাবে সহ্য করবেন? কিন্তু রমার অতো কথা ভাবার সময় কোথায় এখন, সে মাকে চেপে ধরে, “সত্যি কথা বলো,বাবু কোথায়?” না, কোনো কথাই সে বলাতে পারে না। এর মধ্যে তার স্বামী ফিরে আসে। আর নিজেকে সে ধরে রাখতে পারে না, সব কথা বলতে গিয়ে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সব শুনে তিনি রমাকে সাথে নিয়ে থানায় যান। সব ঘটনা লিখিতভাবে জমা করে তারা বাড়ি ফিরে আসে। তারপর পরিচিত সব মানুষ জনের বাড়িতে ফোন করে। কোথাও থেকেই কোনো খবর তারা পায় না। একা বসে বসে ভাবতে থাকে কোথায় আছে ছেলেটা, কি খাচ্ছে, ভাবতে ভাবতেই  হু হু করে কেঁদে ওঠে সে। উফ, কি কুক্ষণে বাবার কথায় রাজি হয়েছিল। নিজের ছোটবেলাটা আবার মনের আয়নায় ফুটে উঠতে থাকে। ছোট থেকেই সে কোনোদিন মায়ের আদর পায় নি। ষাটের দশকের চাকরি করা আধুনিক মহিলা, বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী, কিন্তু প্রথম সন্তান মেয়ে? না, তিনি মন থেকে মানতে পারেন নি। বাবার দুচোখের মনি ছিল সে। দাদু ঠাকুমার আদরের দুলালী। এই আদরের বহিঃপ্রকাশ তাঁর চোখে বাড়াবাড়ি মনে হতো। তার স্বাভাবিক  জীবনের  বেড়ে ওঠার পথে পদে পদে অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন, অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এরপর তার একটি বোন জন্মায়। তারপর তার মায়ের ঔদাসীন্য আরও বেড়ে যায়। দুটি বোন একসাথে বড় হয়ে উঠছিল। তখন এইসব ঘটনা সমাজে গুরুত্বই পেতো না। মায়েরা সবসময় সন্তানের ভালো চান, তাঁরা কোনো অন্যায় করতে পারেন না, যা করেন সব সন্তানের ভালোর জন্য, এই সব চিন্তা ভাবনাই সমাজে মান্যতা পেতো। রমা পারিবারিক মূল্যবোধকে জীবনের সার মেনে মুখ বুজে সব সহ্য করে এসেছে। আর সেজন্যই বাবা যখন তাঁর অবসর জীবন বড়ো মেয়ের কাছে কাটাবেন বলে মনস্থির করেন, তখন রমা যে তার সাথে মায়ের সাথে সম্পর্কের কথা ভাবে নি তা নয়, কিন্তু স্নেহময় বাবাকে সব সময়ের জন্য কাছে পাওয়ার, সেবা করার সুযোগটুকু পেয়ে সে বাকিটা মানিয়ে নেবে বলেই মনস্থির করে।,

প্রথম কয়েক মাস আনন্দে কেটে যায়। দুই নাতিকে সঙ্গে পেয়ে বাবাও খুব আনন্দে আছেন। মা মায়ের মতো থাকেন। একদিন রাতে খেতে বসে মা সেই পুরোনো দিনের কথায় ফিরে যান। তাঁর চাকুরী জীবনের কথায়, অপূর্ণ থাকা ইচ্ছার আলোচনায়। চাকরি করার সাথে সাথে তিনি বামপন্থী সরকারি ইউনিয়নের নেত্রীও ছিলেন। দীর্ঘ দিন রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছা কাছি থাকার জন্য সাধারণ আশাগুলোতেও রাজনৈতিক ছোঁয়া লেগেছিল তাঁর। তিনি চেয়ে ছিলেন যে রমা সেই বামপন্থী দলের সর্বক্ষণের কর্মী  হিসেবে সেই দলে যোগদান করুক। কিন্তু কোন কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি । কথাচ্ছলে বল্লেও তাঁর উষ্মাটুকু তিনি পারেন না লুকোতে। সেই কবেকার একটা সাধারণ ঘটনাকে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে এত বছর ধরে চিহ্নিত করে রেখেছেন, রমা ভাবে, কিন্তু আশ্চর্য হয় না, কারণ সে তার মাকে চেনে। সেই সূত্রপাত। তারপর থেকে মাঝে মধ্যেই তিনি নিজের উষ্মা প্রকাশ করেন। বাবার সাথে ছোট খাটো ব্যাপারে অশান্তি করেন। রমা বোঝায়। এই ভাবে দিন কাটতে থাকে। একদিন অফিসে বাবুর ফোন আসে, কান্না-ভেজা গলায় সে বলতে থাকে যে দিদিমা তার সামনে ছোট ভাইকে মেরেছে।

অফিস থেকে ওরা ফিরতেই তিনি বলতে থাকেন ছোটছেলের দুস্টুমির কথা। বাবু বলে দিদিমার খারাপ ব্যবহারের কথা। রমাদের অনুপস্থিতিতে ছোট ভাইকে উত্যক্ত করার কথা। রাতে মায়ের কাছে শুয়ে বাবু জানায় সারাদিন বাড়িতে নানা অচেনা মানুষের আসার কথা। মা কে জিজ্ঞাসা করলে বলেন অফিসের  লোক, দেখা করতে এসেছিল। রমার স্বামীর বদলির চাকরি, এমতাবস্থায় তারা ঠিক করে যে দুই ছেলেকে আবাসিক স্কুলে ভর্তি করবে। এত অশান্তি, বাবা একদিন বললেন বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাবেন। রমা কেঁদেই অস্থির হলো। এই বয়সে কিভাবে পরিবার থেকে দূরে থাকবে? এর মধ্যেই দুই ছেলেকে তারা দার্জিলিংয়ের বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে। কিছুদিন বাড়িতে শ্মশানের শান্তি বিরাজ করে। কিন্তু কিছুতেই সে মায়ের লাগাতার অন্যায়ের প্রতিবাদ বাবার সামনে মুখ ফুটে করে উঠতে পারেনি। আত্মীয় স্বজনের কথা ভেবে। তিন চার মাস যে না যেতেই বড়ো ছেলে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। জন্ডিস ধরা পড়ে তার। বাধ্য হয়ে ওকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হয়। বাড়ির কাছের এক স্কুলে ওকে ভর্তি করে । মোবাইলটা বাজছে। ফোনটা ধরে সে। ওপার থেকে এক আত্মীয়ের গলা ভেসে আসে। ওরা আজ আসছে। রমা যেন মনে একটু জোর পায়। কিন্তু এ কি শুনছে সে? তারা বলতে এসেছে যে রমার মাকে যেন পুলিশ জ্বালাতন না করে; রমা প্রতিবাদ করে, এটা জ্বালাতন নয়, ওনার উপস্থিতিতে এই ঘটনা ঘটেছে। পুলিশকে সহযোগিতা করা উচিত এখন। বাবার দিকে তাকায় রমা, দুচোখ দিয়ে জল পড়ছে তার। আবার একবার বাবার ভরসার হাতটা মাথার ওপর অনুভব করে সে। চোয়াল শক্ত করে সে বলে চলে....তা নাহলে মা প্রথম দিন থেকে মিথ্যে বলছেন কেন? মাথাটা ক্রমশ পরিস্কার হয়ে আসে তার, স্পষ্ট ভাষায় সে মাকে বলে, “সত্যি কথা তোমায় বলতেই হবে, নাহলে আমি  C.I.Dর কাছে যাবো।”

“একটা কথা পরিষ্কার, আপনার মা সব জানেন", রমা চমকায় না, "শুধু বয়সের কারণে ওনাকে থানায় আনা যাচ্ছে না, থানায় আনা গেলেই উনি ব্রেক করতেন", "তাহলে তাই করুন" রমা বলে। আমরাও তারই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, কিন্তু আজ এক রাজনৈতিক নেতার থেকে ফোন এসেছে। বুঝতেই তো পারছেন, আমরা সরকারি চাকরি করি। থানায় বসে অসহায় রমা তার থেকেও বেশি অসহায় প্রশাসনিক আধিকারিকের দিকে তাকিয়ে থাকে। খানিক চুপ করে থেকে ওসি জিজ্ঞাসা করেন, “আচ্ছা, উনি কি আপনার নিজের মা, না মানে বলছিলাম যে নিজের মা হলে এই কাজটা করা ওনার পক্ষে করা সম্ভব হতো না।” কানের ভিতর দিয়ে কথাগুলো ছেঁড়া ছেঁড়া ভাবে প্রাণে গিয়ে লাগে।তার মানে স্থানীয় থানা আর কিছু করতে পারবে না। নমস্কার করে তারা থানা থেকে বেরিয়ে আসে। বাড়ি ফিরে আসার পথে সে উপলব্ধি করে যে মনের ভিতর  মায়ের সংজ্ঞাটা বদলে গেছে। আচ্ছা, কুমাতা কি সত্যিই হয়? যদিও এখন সমাজ অনেক বদলে গেছে। বর্তমান সমাজে কুমাতার উদাহরণ বিরল নয়। কুমাতাও  সমাজে এখন বিরল নয়। রাতে স্বামী স্ত্রী তে বসে ভাবে, এই ষড়যন্ত্রের হাত থেকে মুক্তির উপায় কি?

ঠিক সকাল দশ টায় C.I.D অফিসে পৌঁছায় তারা। ছেলের হারিয়ে যাওয়ার বিবরণ লিপিবদ্ধ করে। আশায় বুক বাঁধে। এবার নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা হবে। বাড়ি ফেরার পথে পিয়নের সাথে দেখা হয়। সে একটা রেজিষ্ট্রি চিঠি দিতে এসেছিল, বাড়ি বন্ধ থাকায় ফিরে যাচ্ছিল। রমার নামেই চিঠি। মনের মধ্যে তোলপাড় হয়, কিসের চিঠি? মুক্তি পন নয়তো? তাড়াতাড়ি চিঠি খুলে দেখে আদালতের সমন। এ কী নোংরা খেলায় মেতে উঠেছেন উনি? রমার বিরুদ্ধে রমার বাবাকে দিয়ে কোর্টে মামলা করিয়েছেন, মিথ্যা অত্যাচারের নালিশ তার বিষয়বস্তু। ঘেন্নায় সারা শরীর  কেঁপে ওঠে তার, এত নীচে নেমেছেন উনি যে নিজের মা হিসাবে ভাবতেও ঘৃণা বোধ হচ্ছে। কি কুক্ষণে সে ওনাদের কাছে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, বিশ্বাস করেছিল। চিঠিটা হাতে নিয়ে বাবার ঘরে যায়, তার পায়ের শব্দে বাবা ওর দিকে তাকান। রমা সেই কাগজগুলো বাবার দিকে এগিয়ে দেয়। বাবা  পড়তে থাকেন, সে খাটের উপর বসে পড়ে।

..... কিন্তু এই মামলা তো আমি করিনি, বাবা বলেন। তাহলে, তাহলে কি.......উফ, কি সাংঘাতিক ষড়যন্ত্র। বাবার বয়ানে বাবার সই জাল করে এই মামলা করা হয়েছে। এক অশীতিপর, অসহায় বাবা আর তার মেয়ে, দুজনে সেই নিস্তব্ধ ঘরে বসে আছে। বাবা ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত রাখেন, বলেন "আমায় ক্ষমা করে দিও তোমরা, আমারই ভুল হয়েছিল। আমি তো তোমার মাকে চিনতাম, পুত্র সন্তান না জন্মাবার  ক্ষোভ তার ছিল। ছেলেবেলা থেকেই তার সেই ক্ষোভের শিকার তুমি ছিলে। আমি সর্বদাই তোমার ব্যথা অনুভব করতাম। অনেক বুঝিয়েছি তাকেও। তিনি আমাকেও কোনোদিন ক্ষমা করেন নি। আমি এবং তুমি ওর কাছে সমান অপরাধী ছিলাম। সারা জীবন এই অকৃত অপরাধের ভার আমি বয়ে চলেছি। আমি ভেবেছিলাম শেষ জীবনে দুই নাতিকে নিয়ে তিনি খুশি থাকবেন। কিন্তু তার মনের বিকার যে এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে তা আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি । পর ওর এই দুটো ঘটনা আমার চোখ খুলে দিয়েছে, আজ আমার কাছে সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমার আর কিছু বলার নেই। তোমরা পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও", বলতে বলতে তিনি শিশুর মতো হাউহাউ করে কাঁদতে থাকেন। রমা চুপ করে বসে থাকে, সান্ত্বনার ভাষা হারিয়েছে সে, কি নারকীয় মানসিক অত্যাচার তিনি সহ্য করেছেন। আজ সহ্যের শেষ সীমায় এসে ভেঙে পড়েছেন একেবারে। সে ভাবতে থাকে কি কুটিলতার সাথে তার মা একটার পর একটা অপরাধ করে চলেছেন পাকা অপরাধীর মতো। একটা অপরাধকে ঢাকতে গিয়ে আরেকটা অপরাধ করছেন, কি সাঙ্ঘাতিক প্রতিশোধ স্পৃহায়। সব বোধ হারিয়েছেন তিনি। উদ্দেশ্য শুধুমাত্র রমার ক্ষতি করা। তাঁর কাছে রমা সন্তান নয়, এক না চাওয়া  সামাজিক বাধ্যতা। কি চরম মানসিক বিকৃতি। তিনি নিজে যা পান নি রমা কেও তা পেতে দেবেন না। কি ভীষণ ষড়যন্ত্র করেছেন দিনের পর দিন। কেউ অবিশ্বাস করতে পারবেনা। এখন নিজেকে বাঁচাবার জন্য মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে  দিচ্ছেন। “আমায় একটু জল দাও।" সে বাবাকে জল এনে দেয়। বাবা নিজেকে সামলে নিয়েছেন অনেকটা। কিন্তু বাবুকে তার তো খুঁজে বার করতেই হবে, তার সাথে এই মামলায় লড়তে হবে। কোথায়, কার কাছে যাবে সে, ভাবতে গিয়ে হঠাৎ তার মনে  পড়ে ব্যারিস্টার জেঠুর কথা। ছোটবেলায় বাবার সাথে যেত। হাওড়ায় বাড়ি। নামকরা মানুষ, বাড়িটা খুঁজে পেতে অসুবিধা হয় না তার। নাম পরিচয় বলতেই চিনতে পারেন তিনি। সব কথা খুলে বলে রমা। শুনতে শুনতে  তিনি স্বগতক্তির মতো বলতে থাকেন, “এত বছরেও স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হলো না, বুঝলে, কর্মক্ষেত্রেও ওনার ওই স্বভাবের জন্য  সবাই এড়িয়েই চলতো, মানুষের ক্ষতি করতে ওনার হাত কোনো দিন কাঁপে নি। সরকারি চাকরি আর রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে যা খুশি করেছেন তিনি। কেউ কোনোদিন ওনার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় নি। তুমি বোধ হয় ওনার আজীবনের শেষ শিকার। সবাই এড়িয়ে গেলেও তুমি ওনার কাছ থেকে পালাতে পারবে না, কারণ তুমি ওনার সন্তান। আত্মীয়দের চোখে তিনি তোমায় অপরাধী বানিয়েছেন, এবার আইনের চোখেও তোমায় অপরাধী বানাবেন। ওনার বয়সটাকে উনি ঢাল বানিয়েছেন। দীর্ঘদিন আমি ওনাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। মানসিক অত্যাচার করে উনি যত আনন্দ  পান, আর কিছুতে তিনি অত আনন্দ পান না।" রমা ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করে, “তাহলে কি হবে?" “আমি লড়ব এই মামলা.....রমা ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে। “চোখ মোছ, কেঁদে কোনো লাভ নেই। এ লড়াই লড়তেই হবে। তোমার জানা দরকার, তোমার বাবার ভালোমানুষির সুযোগ নিয়ে অফিসে অনেক হেনস্থা ওনাকেও করেছেন। কিন্তু কোনোদিন ভাবিনি ওনার বিরুদ্ধে মামলা লড়তে হবে। এত নীচে নামা ওনার পক্ষেই সম্ভব। আর এটাই বোধ হয় নিয়তি। সারা জীবন ধরে সবাইকে জব্দ করতে করতে আজ নিজের জালে নিজেই পড়েছেন। আদালতের ফাঁদে তোমায় ফেলতে গিয়ে নিজের কি সর্বনাশ ডেকে এনেছেন উনি জানেন না। ওনার অন্যায়ের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছে। তোমার এই কষ্ট আমি নিতে পারবো না, কিন্তু এই মামলা আমি লড়ব।" নতুন ভরসায় বুক বেঁধে রমা বাড়ি ফিরে আসে।

তার পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। আদালতে মামলা ওঠে। বাদী পক্ষ বাবা, বিবাদী পক্ষ মেয়ে, এই মামলা বাবা করেন নি, এক তৃতীয়পক্ষের জালিয়াতিতে এই বিচিত্র মামলার উৎপত্তি। এই তৃতীয় পক্ষ হলো বাবার অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করা স্ত্রী আর মেয়েটির জন্মদাত্রী মা। বাবা লজ্জায় স্ত্রীর বিরুদ্ধে কোথাও অভিযোগ জানাতে পারেন নি, স্ত্রীর কৃতকর্মের দায় নিজের মাথায় নিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। বাবাকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু এ যে কুরুক্ষেত্র, কোনো উপায় নেই। সওয়াল জবাবের শুনানিতে মাননীয় বিচারকের কিছু বুঝতে বাকি থাকে না। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই এই মামলার নিষ্পত্তি হয়। আদালত অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় বাদীপক্ষের নিন্দা করেন। মাননীয় আদালত এই মামলাকে গার্হস্থ্য হিংসার এক অন্যতম দৃষ্টান্ত হিসাবে চিহ্নিত করেন। সেই ভীষণ দিনে বাবা তাঁর বিবাহিত স্ত্রীর সকল কৃতকর্মের ফল মাথায় নিয়ে আদালত থেকে ফিরেছিলেন। তাঁর ন্যুব্জ দেহ আরও ঝুঁকে পড়েছিল। রমা পাথর হয়ে গিয়েছিল। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখেছিল সেই মহিলার আচরণ, যেন কিছুই হয় নি।

আজ বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কত কথা মনে পড়ে যায়। এক বিকৃত বুদ্ধি, অপরাধী মননের মানুষের সাথে দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন কি বিভীষিকাময় ছিল তাঁর, কি ভীষণ যন্ত্রনা তিনি পেয়েছেন সারা জীবন ধরে। কিন্তু কি অসীম ধৈর্য্যের সাথে সেই অগ্নিকে সাক্ষী রেখে করা "যদিদং হৃদয়ং তব" মন্ত্রের সন্মান আমৃত্যু রক্ষা করে গেছেন। আজ তার বাবার চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী।

কবিতা ৮ ।

 সপ্তসিন্ধু পার করে লখিন্দর ফেরে ঘরে।সাথে করে  বিবিধ রতন। শঙ্খ বাজে, উলু দেয় এয়োতি, পুরজন। বাপ তার, চন্দ্র সওদাগর। লখার সাফল্যে মুখে তার  গো...